কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর হলো একটি জীবন রক্ষাকারী বিশেষ কৌশল। সাধারণত যখন কোনো ব্যক্তির হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বলা হয়, তখন সঠিক সময়ে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়।
আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর পাই যে, আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ সুস্থ কোনো মানুষ হঠাৎ করে অচেতন হয়ে পড়েছেন বা মারা গেছেন। অফিসের কাজেরতত, খেলার মাঠে কিংবা যেকোনো সাধারণ স্থানে আকস্মিক এই মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে সময়মতো সিপিআর দিতে পারলে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
যদি দেখা যায় যে কোনো ব্যক্তি আচমকা জ্ঞান হারিয়েছেন এবং তাঁর হৃদ্যন্ত্র সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, যা ঘাড়ের পাশে হাত দিয়ে ক্যারোটিড পালস পরীক্ষা করে বোঝা যায়, তবে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তাঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। এই মুহূর্তে দেরি না করে অনতিবিলম্বে সিপিআর শুরু করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হওয়ার পরও আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো শ্বাস নিতে পারেন অথবা নাও পারেন; অনেক ক্ষেত্রে শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক হতে পারে।
সিপিআর শুরুর আগে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে যে পরিবেশটি নিরাপদ কি না। এরপর আক্রান্ত ব্যক্তির চেতনা আছে কি না তা বোঝার জন্য তাঁকে জোরে জোরে ডাকতে হবে। পাশাপাশি ক্যারোটিড পালস অনুভব করার চেষ্টা করতে হবে এবং তিনি শ্বাস নিচ্ছেন কি না তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি দেখা যায় যে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো সাড়া দিচ্ছেন না এবং তাঁর ক্যারোটিড পালস পাওয়া যাচ্ছে না, তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিপিআর প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
সিপিআর শুরু করার পাশাপাশি অবিলম্বে জরুরি সেবা সেন্টারে ফোন করে সাহায্য চাওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই কাজের জন্য সর্বোচ্চ ১০ সেকেন্ড সময় ব্যয় করা যাবে। কারণ, শুধুমাত্র সিপিআর প্রয়োগ করে এ ধরনের রোগীকে দীর্ঘক্ষণ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।
পদ্ধতির কথা বলতে গেলে, প্রথমে এক হাতের তালু বুকের ওপর রেখে তার ওপরে অন্য হাতের তালু বসিয়ে বুকের মাঝের অংশে জোরে চাপ বা চেস্ট কম্প্রেশন দিতে হবে। প্রতি মিনিটে এই চাপ ১০০ থেকে ১২০ বার দিতে হবে এবং চাপের গভীরতা হতে হবে প্রায় ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার বা ২ ইঞ্চি। এভাবে বুকে প্রতিবার ৩০টি চাপ দেওয়ার পর ২ বার কৃত্রিম শ্বাস দিতে হবে।
কৃত্রিম শ্বাস দেওয়ার সময় আক্রান্ত ব্যক্তির নাক বন্ধ করে মুখের মাধ্যমে শ্বাস দিতে হয়। এসময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বুক ওপরে-নিচে ওঠানামা করছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত কিছুটা ভিন্ন হয়; সেখানে ১৫:২ অনুপাত ব্যবহার করা হয়। একেবারে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বুকে চাপ দেওয়ার সময় দুই আঙুল ব্যবহার করতে হয় এবং শ্বাস দেওয়ার সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে হয়। এই প্রক্রিয়ার মাঝে প্রতি ২ মিনিট পরপর ক্যারোটিড পালস পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
যদি আশপাশে এইডি (AED) যন্ত্রের ব্যবস্থা থাকে, তবে দ্রুত তা বুকে লাগাতে হবে। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে এই বৈদ্যুতিক যন্ত্রটি রোগীর জীবন বাঁচাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সাধারণত বিমানবন্দর, বিমান, মেট্রোস্টেশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই যন্ত্রটি রাখা থাকে, যা হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। এইডি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ত সঞ্চালন ফিরে না আসে, অর্থাৎ ক্যারোটিড পালস সচল না হয় অথবা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা না করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সিপিআর চালিয়ে যেতে হবে।
চিকিৎসক, নার্স, ফায়ার সার্ভিস কর্মী, ডুবুরি এবং উদ্ধারকর্মীসহ সকল শিক্ষিত ব্যক্তির সিপিআর প্রশিক্ষণ থাকা অত্যন্ত জরুরি। উন্নত দেশগুলোতে স্কুল ও কলেজের শিক্ষাক্রমেও সিপিআর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেহেতু অপ্রশিক্ষিত কোনো ব্যক্তি কোনোভাবেই সঠিকভাবে সিপিআর দিতে পারেন না, তাই সাধারণ মানুষকে এই বিষয়ে শিক্ষিত করতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন, বারডেম হাসপাতাল