‘অনেক প্রার্থনা করেছি, মেয়েটা যেন সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু পুতুলের মতো মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। অনেক চেষ্টা করেছি। কোনোভাবেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলাম না।’

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আট বছর বয়সী শিশু ঐশী দাসের অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মাঝে। আজ শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলী বাংলাবাজার এলাকায় তার বাড়িতে কথা বলে শিশুটির চাচা মিটন দাস।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঐশী দাসের মৃত্যু হয়। সে কাট্টলী এলাকার একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবা লিটন দাস পেশায় কুয়েতপ্রবাসী। মা লিপি দাস কাট্টলীর নিজ বাড়িতে ঐশী এবং সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত বড় মেয়ে রুহি দাসকে নিয়ে বসবাস করেন।

শুক্রবার সকালে ঐশীর বাড়িতে গেলে দেখা যায়, সেখানে শোকের মাতম চলছে। বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছেন অনেক আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশী। সন্তানকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তার মা লিপি দাস।

বাবা বিদেশ থেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় ঐশীর মরদেহ ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। শুক্রবার সকালেই কুয়েত থেকে ফিরে আসেন বাবা লিটন দাস। বাড়ির সামনে এসেই মেয়ের মরদেহ দেখার জন্য আহাজারি করতে করতে ছুটে যান তিনি। এই দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তর কাট্টলী সনদ দত্ত মহাশ্মশানে ঐশীর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

ঐশীর চাচা মিটন দাস জানান, ডেঙ্গুতে ঐশীর মৃত্যুতে তার বাবা, মা ও বোন সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাঁরা কেউই বর্তমানে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। পরিবারের সবার কাছে মেয়েটি অত্যন্ত প্রিয় ছিল, তাই তার এই আকস্মিক প্রস্থান কেউই মেনে নিতে পারছেন না।

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার ঐশীর শরীরে ১০৩ ডিগ্রি জ্বর দেখা দেয়। এরপর দ্রুত তাকে মা ও চাচা মিলে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলে তার শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকেরা তাকে বাসায় রেখে চিকিৎসা দেওয়ার পরামর্শ দেন।

চিকিৎসকদের কথা অনুযায়ী ঐশীকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হয়। বাসায় এসে সে সামান্য কিছু ভাত খেয়েছিল, কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই তার বমি শুরু হয়। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে পুনরায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে চট্টগ্রামের জিইসি মোড় এলাকার রয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ঐশীকে। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।

চাচা মিটন দাস জানান, রয়েল হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা খালি না থাকায় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে বায়েজিদ এলাকার সাজিনাস হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আইসিইউতে ভর্তি করার পর তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে চিকিৎসকেরা ঐশীকে মৃত ঘোষণা করেন।

চিকিৎসকদের মতে, গত কয়েক মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে এই জেলায় সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৮৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চলতি বছরের গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত হাজারে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত এই জেলায় মোট ৬ হাজার ৯২৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৩৬৬ জন। এ বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫ জনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে চলতি অক্টোবর মাসে মারা গেছেন ১৪ জন। ঐশী দাসের মৃত্যুর পর এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ জনে।