তীব্র গরমের মৌসুম এখন প্রায় শেষের দিকে। প্রকৃতির মাঝেও শীতের আগমনের বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। তবে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে ফরিদপুরের বাজারে ডাবের দাম কমেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ক্রেতা ও বিক্রেতারা।

গত সোমবার (৫ অক্টোবর) শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতি পিস ডাব ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফরিদপুর শহরের কোটপাড়, কোতোয়ালি থানা রোড, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা এবং বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভ্যান ও গাড়িতে করে ডাব বিক্রি করতে দেখা যায়। বিক্রেতাদের দাবি, এসব এলাকায় ডাবের চাহিদা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তবে ওই দিনের বাজারদরের কোনো সরকারি তালিকা কিংবা স্বাধীন বাজার জরিপের তথ্য পাওয়া যায়নি।

গত প্রায় ১০ বছর ধরে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ডাব সংগ্রহ করে ব্যবসা করছেন মাসুদ খান। তিনি জানান, মাত্র এক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করে বর্তমানে তিনি প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার ডাব বিক্রি করেন বলে দাবি করেন।

মাসুদ খানের দাবি অনুযায়ী, গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতি পিস ডাব ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে কিনতে হয়। এর সাথে গাছ থেকে ডাব পাড়ার শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ হয়ে শহরে পৌঁছানোর পর প্রতিটি ডাবের খরচ পড়ে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ টাকা।

তিনি বলেন, “কয়েকটি ভ্যান মিলিয়ে প্রতিদিন তার লাভ থাকে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকা।” মাসুদ খান আরও বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ডাব বিক্রি করছি। সামনে শীত আসছে, গ্রামাঞ্চলেও শীতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তারপরও শহরে ডাবের দাম খুব একটা কমেনি। আমরা গ্রাম থেকে ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে ডাব কিনি। গাছ থেকে ডাব পাড়ার খরচ, পরিবহনসহ নানা ব্যয় রয়েছে। সব মিলিয়ে শহরে আনতে প্রতিটি ডাবের খরচ অনেক বেড়ে যায়। ফলে এভাবেই প্রতিদিন ভ্যান গাড়িতে করে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার ডাব বিক্রি করি।”

ব্যবসায়ীদের দাবি, কেবল গরমের কারণেই নয়, বরং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের তরল খাবারের প্রয়োজনীয়তার কারণেও ডাবের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ডেঙ্গু রোগীদের কারণে ডাবের চাহিদা ঠিক কতটা বেড়েছে, সে বিষয়ে কোনো হাসপাতালভিত্তিক বিক্রয় তথ্য, বাজার জরিপ কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক ডাব ব্যবসায়ী এবং জেলা সদরে অন্তত ২০ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন বলে দাবি করেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্যমতে, জেলার বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, নগরকান্দা, ভাঙ্গা, চরভদ্রাসন ও মধুখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় ডাব গাছ রয়েছে এবং এসব এলাকা থেকেই শহরে ডাব সরবরাহ করা হয়।

ডাব কিনতে আসা ক্রেতা হারুন অর রশিদ বলেন, “গরমে শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলে একটি ডাব খেলে বেশ স্বস্তি পাওয়া যায়। তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি ডাবের পানি পান করলে শরীর সতেজ লাগে। দাম একটু বেশি হলেও প্রয়োজনের কারণে কিনতে হয়। আজ একটি ডাব ১৫০ টাকা দিয়ে কিনেছি।”

হারুন অর রশিদের বক্তব্যে তার কেনা একটি ডাবের দাম জানা গেলেও এটিকে পুরো বাজারের গড়দর হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবে সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন বিভিন্ন এলাকায় ডাব ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে স্থান ও বিক্রেতাভেদে দামে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।

ডাবের পানিকে ঘিরে মানুষের অতিরিক্ত প্রত্যাশার বিষয়ে সতর্ক করেছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। মধুখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহাবুব ইলাহী বলেন, যে কোনো ফল পাড়ার পর যত দ্রুত খাওয়া যায়, ততই ভালো। তাজা ফলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ভালোভাবে পাওয়া যায়। তবে কোনো খাবারই অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়।

তিনি বলেন, “ডাবের পানিতে পটাশিয়াম রয়েছে এবং সোডিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলক কম। তাই অতিরিক্ত ডাবের পানি পান করাও সব সময় উপকারী নয়। বিশেষ করে যাদের কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পটাশিয়াম ক্ষতির কারণ হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডাবের পানি পান করা উচিত।”

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও ডাবের পানি নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা না করার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শরীরে পানিশূন্যতা পূরণে তরল খাবার গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু ডাবের পানি খেলেই দ্রুত সুস্থ হয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তরল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুরি।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মাহমুদুল হাসান বলেন, “ডাবের পানি শরীরের জন্য ভালো, তবে বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে এটি নির্দিষ্ট চিকিৎসার বিকল্প নয়।” তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার কিংবা যেসব স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে, সেসব জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব স্থানে এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।