ল্যাপটপে স্পর্শনির্ভর বা টাচস্ক্রিন প্রযুক্তির ব্যবহারকে একসময় গুরুত্বহীন মনে করে উপহাস করেছিল অ্যাপল। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টিম কুক ২০১৩ সালে এই ধরনের উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তবে সময়ের পরিক্রমায় নিজেদের সেই অবস্থান পরিবর্তন করে এবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘ম্যাকবুক প্রো উইথ প্রোলেড এক্সডিআর ডিসপ্লে’ মডেলের স্পর্শনির্ভর ম্যাকবুক আনার ঘোষণা দিয়েছে অ্যাপল। আগামী ৬ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত করা হবে এই নতুন ল্যাপটপটি।
স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার ফলে কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ল্যাপটপে টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি যুক্ত করতে শুরু করে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাজারে এ ধরনের ল্যাপটপ পাওয়া গেলেও অ্যাপল এই প্রযুক্তি থেকে দূরে ছিল। তবে এবার সেই পুরনো অবস্থান বদলে স্পর্শনির্ভর ল্যাপটপের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রবেশ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
মূলত সৃজনশীল পেশাজীবী, গ্রাফিক ডিজাইনার এবং অ্যাপ নির্মাতাদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যেই এই নতুন ম্যাকবুক প্রো আনা হয়েছে। অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে জন টার্নাস দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দুই মাসের মধ্যেই বেশ কয়েকটি নতুন পণ্য উন্মোচন করেছে কোম্পানিটি। স্পর্শনির্ভর এই ম্যাকবুক সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ সংযোজন।
নতুন এই ল্যাপটপটি ১৪ ও ১৬ ইঞ্চি পর্দার দুটি সংস্করণে পাওয়া যাবে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে অ্যাপলের শক্তিশালী এম৫ প্রো অথবা এম৫ ম্যাক্স চিপ। ১৪ ইঞ্চি সংস্করণের দাম শুরু হবে ২ হাজার ৮৯৯ ডলার থেকে এবং ১৬ ইঞ্চি সংস্করণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৯ ডলার। এই ল্যাপটপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা আঙুলের স্পর্শেই এক প্রেজেন্টেশন থেকে অন্য প্রেজেন্টেশনে স্লাইড টেনে নিতে পারবেন। অ্যাপ নির্মাতারা এখন নিজেদের কম্পিউটারেই সরাসরি অ্যাপের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে পারবেন। পাশাপাশি গ্রাফিক ডিজাইনাররা পর্দায় সরাসরি ছবি ও নকশা আঁকতে পারবেন এবং সংগীতশিল্পীরা স্পর্শের মাধ্যমে ভার্চ্যুয়াল বাদ্যযন্ত্র বাজানোর সুযোগ পাবেন।
অ্যাপলের দাবি, নতুন ল্যাপটপে ব্যবহারের জন্য বর্তমানে বিদ্যমান অ্যাপগুলোতে কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হবে না। কারণ, সফটওয়্যারগুলো পর্দায় আঙুলের স্পর্শকে মাউসের ক্লিক হিসেবেই শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। ফলে প্রচলিত অনেক অ্যাপই এই নতুন টাচস্ক্রিনে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে।
নতুন ম্যাকবুক প্রোতে আইফোনের জনপ্রিয় ডায়নামিক আইল্যান্ড সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সৃজনশীল কাজের কথা মাথায় রেখে ল্যাপটপটির সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতার ডিসপ্লের ভেতরেই টাচ সেন্সর বসিয়েছে অ্যাপল, যা আগের সংস্করণের চেয়ে উন্নত। ফলে পর্দার ওপর আলাদা কোনো স্তর বসানোর প্রয়োজন পড়েনি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই বিশেষ প্রযুক্তির কারণে পর্দায় আঙুল দিয়ে সোয়াইপ ও স্ক্রল করার সময় অত্যন্ত দ্রুত সাড়া পাওয়া যাবে এবং স্পর্শের পর কম্পিউটারের প্রতিক্রিয়া জানাতে যে সময় লাগে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
যদিও বিভিন্ন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান স্পর্শনির্ভর পর্দার ল্যাপটপ বাজারে এনেছে, তবে সামগ্রিকভাবে এগুলোর চাহিদা খুব বেশি নয়। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের (আইডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে সরবরাহ করা মোট ল্যাপটপের মাত্র ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল স্পর্শনির্ভর। আইডিসির গ্রুপ ভাইস প্রেসিডেন্ট রায়ান রেইথের মতে, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে খুব একটা আগ্রহী নয়। কারণ, অধিকাংশ কর্মী অফিসে ডেস্কে বসে কাজ করার সময় ল্যাপটপের সঙ্গে আলাদা মনিটর যুক্ত করেন, ফলে তাদের কাছে টাচস্ক্রিন ল্যাপটপের প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলক কম।
উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালে ম্যাকবুক প্রোতে স্পর্শনির্ভর প্রযুক্তি যুক্ত করার একটি চেষ্টা করেছিল অ্যাপল। সে সময় কি-বোর্ডের ঠিক ওপরে ‘টাচ বার’ নামে স্পর্শনির্ভর একটি সরু প্যানেল যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাপের নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় শর্টকাট ব্যবহার করা যেত। কিন্তু বাড়তি খরচের তুলনায় এর কার্যকারিতা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেছিলেন অনেক ব্যবহারকারী। ফলে শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের মধ্যে সেই ল্যাপটপটি জনপ্রিয়তা পায়নি।