কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাসের সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। প্রকৌশল এবং পণ্য উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা, বিনিয়োগকারীদের উচ্চাশা এবং প্রযুক্তি খাতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি—সবকিছুই এখন তাঁর সামাল দেওয়ার তালিকায়। স্টিভ জবসের সেই কিংবদন্তি উদ্ভাবনী ঐতিহ্য এবং টিম কুকের সুদক্ষ ব্যবসায়িক নেতৃত্বের পর অ্যাপলকে তিনি কোন দিশায় নিয়ে যান, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
গত ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন জন টার্নাস। এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর কর্মজীবনের পথচলা দীর্ঘ ২৫ বছরের। প্রকৌশল ও পণ্য উদ্ভাবনে তাঁর বিশেষ দক্ষতার কারণে ম্যাক কম্পিউটার, আইপ্যাড, এয়ারপডস এবং আইফোনের মতো বৈশ্বিক জনপ্রিয় পণ্যগুলোর উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভোক্তাদের অভিজ্ঞতা বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই পণ্যগুলো অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালে অ্যাপলের জ্যেষ্ঠ হার্ডওয়্যার নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানের পণ্য উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়।
তবে পণ্য উন্নয়নের নেতৃত্ব দেওয়া আর বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। নতুন এই ভূমিকায় তাঁকে কেবল প্রযুক্তি ও নকশার দিকে নজর দিলেই চলবে না; বরং বিনিয়োগকারী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং বৈশ্বিক ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করতে হবে।
গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাপলের নতুন ভাঁজযোগ্য ফোন ‘ডুয়ো’ উন্মোচনের অনুষ্ঠানে এই পরিবর্তনের একটি বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। ১ হাজার ৯৯৯ ডলার মূল্যের এই ফোনটির উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রযুক্তিপ্রেমী, সংবাদকর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ২১ বছর বয়সী জনপ্রিয় ইউটিউব তারকা আইশোস্পিড, যাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৬ কোটি ১০ লাখে পৌঁছেছে।
ফোনটি হাতে নিয়ে কয়েকটি ছবি তোলার পর জন টার্নাস আইশোস্পিডের সঙ্গে কথা বলেন। নতুন এই পণ্যটি দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ওই ইউটিউব তারকা। তবে তাঁদের এই সাক্ষাতের একটি মুহূর্ত দর্শকদের বিশেষ নজর কাড়ে। টার্নাস যখন ফোনটি ব্যবহার করে একটি ছবি বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁর হাত কাঁপতে দেখা যায়। পুরো ঘটনাটি আইশোস্পিডের ইউটিউব চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছিল।
পরবর্তীতে টাইম ম্যাগাজিনকে জন টার্নাস বলেন, “আগের রাতে তাঁর তেমন ঘুম হয়নি। সেই সঙ্গে ছিল কফি পান করে চাঙা থাকার চেষ্টা। ফলে তাঁর মধ্যে ছিল প্রচণ্ড উত্তেজনা।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই ঘটনাটি তাঁর নেতৃত্বের সক্ষমতা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না। তবে অ্যাপলের প্রধান হিসেবে জনসমক্ষে উপস্থিতি এবং কার্যকর যোগাযোগের গুরুত্ব যে আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাস্তবতা হলো, পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুকরণ না করে টার্নাস নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপরই ভরসা রাখছেন। অ্যাপলের মূল শক্তি মূলত সুন্দর ও কার্যকর পণ্য তৈরির মধ্যেই নিহিত। এমন পণ্য উদ্ভাবন করা, যা মানুষের দৈনন্দিন কাজ সহজ করে, সৃজনশীলতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং একই সঙ্গে আনন্দ প্রদান করে।
আইশোস্পিডের সঙ্গে টার্নাসের এই সাক্ষাতের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেই বিশেষ দিকটিই ফুটিয়ে তোলা। পাশাপাশি আইশোস্পিডের বিপুলসংখ্যক তরুণ অনুসারীদের আকৃষ্ট করে নতুন পণ্যের আগাম ক্রয়াদেশ বা প্রি-অর্ডার বাড়ানোও ছিল এই কৌশলের একটি লক্ষ্য।
তবে সমালোচকদের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্ন। তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে অ্যাপল হয়তো নিজেদের পুরোনো সুনাম ও আকর্ষণকে পুঁজি করে কেবল দামি পণ্য বিক্রির চেষ্টা করছে।
জবস ও কুকের উত্তরাধিকার
জন টার্নাসের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তিনি অ্যাপলের আগের দুই প্রধান নির্বাহীর ধারাবাহিকতাকে কীভাবে এগিয়ে নেবেন।
স্টিভ জবস অ্যাপলকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে পণ্যগুলো কেবল কার্যকারিতার জন্য নয়, বরং নকশা, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত আবেগের সঙ্গে মিশে থাকত। প্রযুক্তি মানুষের জীবন কীভাবে আমূল বদলে দিতে পারে, তা চমৎকারভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে অ্যাপলের পণ্য বিশ্বজুড়ে এক অনন্য পরিচিতি লাভ করে।
অন্যদিকে, টিম কুকের নেতৃত্বের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল বৈশ্বিক ব্যবসা পরিচালনা, দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের জটিলতা সামলানোর অসাধারণ ক্ষমতা। অ্যাপলের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। কুকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানটির এই বৈশ্বিক অবস্থান ধরে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
জন টার্নাস তাঁদের দুজনের চেয়েই আলাদা। তিনি একজন প্রকৌশলী হিসেবে খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রভাবশালী হলেও বাইরের দুনিয়ায় তিনি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত ছিলেন। এখন তাঁকেই অ্যাপলের পণ্য, ব্যবসায়িক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রধান মুখ হয়ে উঠতে হবে।
জন টার্নাস যখন দায়িত্ব নিলেন, তখন বিশ্বের প্রযুক্তি খাত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় অগ্রগতি, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে তীব্র প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর ভূরাজনৈতিক চাপ বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।