গত ২৩ অক্টোবর বাজারে এসেছে অ্যাপলের নতুন ভাঁজযোগ্য বা ফোল্ডেবল স্মার্টফোন আইফোন ডুও। তবে বাজারে আসার অল্প সময়ের মধ্যেই ফোনটির স্থায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বেশ কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেছেন যে, ফোনটির পর্দায় ফাটল, ডেড পিক্সেল এবং অদ্ভুত রেখা দেখা দিচ্ছে। ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ফোনটি কেনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এর পর্দা ফেটে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্যবহারকারীরা এই সমস্যাটির নাম দিয়েছেন ‘ক্র্যাকগেট’।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের বর্ণনা অনুযায়ী, ফোনটি ভাঁজ করে খোলার সময় প্রথমে কবজায় (হিঞ্জ) অস্বাভাবিক শক্তভাব অনুভূত হয়। এরপর একটি শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় ফাটল দেখা দেয়। অনেক ব্যবহারকারীর দাবি, তাঁরা ফোনটি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করার সময়ই এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক আইফোন ডুওর পর্দায় প্রায় একই ধরনের ফাটল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পর্দার মাঝখানের ভাঁজ বরাবর লম্বা ফাটল দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি পর্দার একাংশে ভাঙা বা চিপ উঠে যাওয়ার মতো ক্ষতিও লক্ষ্য করা গেছে। কিছু ফোনের ক্ষেত্রে ডান পাশের পর্দাজুড়ে উজ্জ্বল রেখা তৈরি হয়েছে, যা ডেড পিক্সেলের কারণে ঘটছে বলে জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা।

এদিকে ফোনটির তীব্র সরবরাহসংকট গ্রাহকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনলাইনে আইফোন ডুওর সব রং ও স্টোরেজ সংস্করণ ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। নতুন অর্ডার দিলে আগামী বছরের ২২ জানুয়ারির আগে ফোন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে ত্রুটিপূর্ণ ফোন বদলে নিতে চাইলেও গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

অ্যাপলের দাবি, “আইফোন ডুওর কবজা এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে পর্দার মাঝখানে ভাঁজের দাগ কম থাকে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের পরও ফোনটি নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে।” তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা এই দাবির বিপরীত। রেডিটে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আইফোন ডুও কেনার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর ফোনের পর্দায় ফাটল দেখা দেয়। এর আগে তিনি ফোনটি বড়জোর ২০ বার খুলেছিলেন। এরপর হঠাৎ একটি ‘পপ’ শব্দ শুনতে পান। পরে দেখতে পান, পর্দা ফেটে গেছে।”

আরেকজন ব্যবহারকারী জানান, ফোনটি হাতে পাওয়ার ছয় ঘণ্টার মধ্যে তিনি ২০ বারের কম এটি খুলেছিলেন। এক বন্ধুকে ফোনটি দেখানোর জন্য খোলার সময় ভেতরের কবজার কাছে অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করেন তিনি। ফোনটি আরও খুলতেই ফাটার শব্দ হয় এবং কবজার বরাবর পর্দা ভেঙে যায়।

অন্য এক গ্রাহকের দাবি, ফোনের প্রাথমিক সেটআপ শেষ করার আগেই পর্দায় ফাটল দেখা দেয়। মাত্র চারবার ফোনটি খোলার পর এ ঘটনা ঘটে। তাঁর ভাষ্য, “কবজাটি শক্ত হয়ে যাওয়ার পর একটু বেশি চাপ দিয়ে ফোনটি খুলতে গেলে বিকট শব্দ হয়। এরপরই পর্দা ফেটে যায়।” একাধিক ব্যবহারকারীর অভিযোগে একই ধরনের লক্ষণ উঠে এসেছে। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে কবজায় অস্বাভাবিক শক্তভাব অনুভূত হয়, এরপর শব্দের সঙ্গে পর্দায় ফাটল তৈরি হয়। ফাটলগুলোর আকৃতিও প্রায় একই রকম, যা দেখতে ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মতো।

তবে এই গুরুতর সমস্যাটির কারণ সম্পর্কে অ্যাপল এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের ত্রুটির বিষয়ে অবগত কি না, তা-ও নিশ্চিত করেনি। অন্যদিকে, প্রযুক্তিপণ্য মেরামতবিষয়ক ওয়েবসাইট আইফিক্সিট ফোনটির ভেতরের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করে সম্ভাব্য কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে। আইফোন ডুওর মেরামতযোগ্যতা যাচাই করতে ফোনটি খুলে পরীক্ষা করে আইফিক্সিট দেখেছে যে, এটির কবজার কাঠামো বেশ জটিল। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, কবজার কোনো একটি অংশ ঠিকভাবে নড়াচড়া না করলে পর্দার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। ফোনের ভেতরে থাকা একটি তারও এমন জায়গা দিয়ে গেছে, যেখান থেকে ব্যবহারকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী পর্দায় ফাটল ছড়িয়ে পড়ছে। কবজার কোনো অংশ ঠিকমতো ভাঁজ না হওয়া এবং ভেতরের যন্ত্রাংশগুলোর অবস্থানের কারণে পর্দায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে আইফিক্সিট।

দক্ষিণ কোরিয়ার ইউটিউবার কিউরিয়াসহাগিও ফোনটির স্থায়িত্ব পরীক্ষা করার সময় একই ধরনের ফাটল তৈরির ঘটনা পুনরায় ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। পরে ফোনটি খুলে পরীক্ষা করে তিনি দেখতে পান, কবজার ভেতরের একটি ছোট যন্ত্রাংশ ভেঙে গেছে। তাঁর পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই যন্ত্রাংশ ভেঙে যাওয়ার প্রভাবেই পর্দায় ফাটল তৈরি হয়েছে। যন্ত্রাংশটি কবজার আশপাশের অন্য অংশগুলোর তুলনায় পাতলা। ফলে কবজার যান্ত্রিক ব্যবস্থা আটকে গেলে বা ঠিকভাবে কাজ না করলে এটি ভেঙে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সমস্যাটির প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।

এ ধরনের ত্রুটি মেরামতের খরচও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য অনেক বেশি। অ্যাপলের ওয়ারেন্টি নীতিমালা অনুযায়ী, দুর্ঘটনা বা অসতর্ক ব্যবহারের কারণে নয়, স্বাভাবিক ব্যবহারের সময় কবজায় ত্রুটি দেখা দিলে এক বছরের ওয়ারেন্টির আওতায় মেরামতের সুযোগ রয়েছে। তবে ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আইফোন ডুওর মেরামত খরচ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা অনেক নতুন স্মার্টফোনের দামের চেয়েও বেশি।

তবে কিছু ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক অ্যাপলের কাছ থেকে পুরো টাকা ফেরত পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। রেডিটে কয়েকজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, অনলাইনে নতুন ফোনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে সরাসরি অ্যাপল স্টোরে গিয়ে প্রতিস্থাপনের আবেদন করেছিলেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নতুন ফোনও পেয়েছেন।

আইফোন ডুওর পর্দায় ফাটল তৈরির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অ্যাপল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ফলে কবজার নকশা, কোনো যন্ত্রাংশের ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে এই সমস্যা হচ্ছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।