রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। এই নতুন নির্দেশিকায় কোন সড়কে ই-রিকশা চলতে পারবে, কোথায় নিষেধাজ্ঞা থাকবে, সর্বোচ্চ গতিসীমা কত হবে, যাত্রী বহনের সীমাবদ্ধতা এবং চালক ও রিকশার নিবন্ধনের শর্তাবলি বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ গত বৃহস্পতিবার ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত ১২ পৃষ্ঠার এই বিধিমালাটি দেশের সকল সিটি করপোরেশন এলাকার ই-রিকশার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

নতুন বিধিমালার নির্দেশনা অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক এবং কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিষিদ্ধ সড়কে ই-রিকশা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া ফুটপাতে এসব যান চালানো যাবে না। কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নিবন্ধিত অটোরিকশা অন্য কোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।

বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, ই-রিকশা চলাচলের রুট সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে নির্ধারণ করবে। এই রুট হবে জোনভিত্তিক, যার ফলে এক জোনের ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না। চলাচল নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ জোনভিত্তিক বিভক্তকরণ, ই-রিকশার সংখ্যা, নির্দিষ্ট রুট এবং রঙের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে।

উল্লেখ্য যে, বিধিমালার ভেতরে ঢাকার কোন কোন নির্দিষ্ট সড়কে ই-রিকশা চলবে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হয়নি। এই তালিকা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের ওপর। ফলে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সব অলিগলিতেই ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে—এমনটি বলা যাবে না।

বিধিমালার ৭ ধারায় জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক (বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট) এবং কর্তৃপক্ষ সময়-সময় যেসব সড়কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, সেসব সড়কে ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া চালককে সব সময় সড়কের বাঁ লেন অনুসরণ করে চলাচল করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূতভাবে ওভারটেক ও লেন পরিবর্তন করা যাবে না।

নতুন বিধিমালার আওতায় তিন চাকার ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় বা জনবহুল স্থানে ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। চালক ছাড়া ই-রিকশায় দুই অথবা চারজনের বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। অর্থাৎ অনুমোদিত দুই বা চার আসনের ধারণক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়ার সুযোগ নেই। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না। একই সঙ্গে ৪০ ডেসিবেলের বেশি তীব্রতাসম্পন্ন হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ই-রিকশা চালানোর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন নিতে হবে। চালককে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত ব্যক্তি এই নিবন্ধন পাবেন না। নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ ও ফিটনেস সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে।

কর্তৃপক্ষ আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে নিবন্ধন প্রদান করবে। নিবন্ধিত প্রতিটি ই-রিকশাকে কিউআর কোডযুক্ত ইউনিক নিবন্ধন নম্বর ও নম্বরপ্লেট দেওয়া হবে, যা রিকশার দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। অন্যদিকে, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে কোনো এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে।

প্রতিটি ই-রিকশাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কর্তৃক নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হবে। প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার ও ওডোমিটার স্থাপন করা বাধ্যতামূলক। বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধনের তারিখ থেকে প্রতিটি ই-রিকশার ইকোনমিক লাইফটাইম হবে ১২ বছর। এই মেয়াদ শেষ হলে নম্বরপ্লেটসহ সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন বাতিল করতে হবে।

ই-রিকশার ফিটনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর এবং নিবন্ধন নবায়নের ক্ষেত্রে পুনরায় ফিটনেস যাচাই করতে হবে। বর্তমানে রাস্তায় চলাচলকারী ই-রিকশার ক্ষেত্রেও বুয়েট নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংশোধন করে অনুমোদন নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রত্যয়নসহ ফিটনেস সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাসমূহকে বিমার আওতায় আনতে হবে।

ই-রিকশার জন্য সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের পরামর্শক্রমে প্রতিটি ওয়ার্ডে বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণ করা হবে। কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজে ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যাবে। এসব চার্জিং পয়েন্ট বা গ্যারেজে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে।

বৈধভাবে নিবন্ধিত চার্জিং স্টেশনে ব্যাটারি চার্জ করতে হবে। সেখানে নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিড সংযোগের পাশাপাশি সৌর প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রয়োজন হলে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ ও রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়া হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দণ্ড দেওয়া হবে।

ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নতুন বিধিমালার শর্ত দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি বা তার অংশবিশেষ উন্মুক্ত স্থান, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে পারবে না। নতুন ব্যাটারি কেনার সময় বিক্রেতাকে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহ করা ব্যাটারি পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর কার্যক্রমে নিয়োজিত হতে পারবে না। পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি কেবল অনুমোদিত এজেন্ট, ডিলার বা সংগ্রহকারীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

বিধিমালায় নিবন্ধন ছাড়া ই-রিকশা চালানো, অনুমোদিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনুমোদিত ব্যাটারির ব্যবহার না করা, মোটর বা কাঠামো পরিবর্তন, নিষিদ্ধ এলাকায় চালানো, বিপজ্জনকভাবে চালানো, যাত্রীর বাড়তি মালামাল পরিবহন, সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসব অপরাধের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষেত্রমতো চালক তাৎক্ষণিকভাবে থানায় অথবা সাধারণ ডায়েরি এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন। পাশাপাশি পুলিশ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে।

নতুন বিধিমালার আওতায় ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যও অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি সুপারিশ প্রদান কমিটি থাকবে। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রাফিক পুলিশ, বুয়েটের প্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি থাকবেন।

কমিটি বুয়েট নির্ধারিত ই-রিকশার প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ডিজাইন, স্পেসিফিকেশনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের সুপারিশ করবে। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উৎপাদন লাইসেন্স দেবে।

এ ছাড়া সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তফসিলি ব্যাংক কিংবা ফাইন্যান্স কোম্পানি অনুমোদিত মানের ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চালক ও মালিকপক্ষকে ঋণসহায়তা দিতে পারবে।

নতুন বিধিমালা কার্যকর হলেও কোন সিটি করপোরেশনে কতটি ই-রিকশা চলবে, কোন কোন সড়ক দিয়ে চলবে এবং কোন জোনে কোন রঙের ই-রিকশা চলবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারণ করতে হবে। বিধিমালায় সিটি করপোরেশনকে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজ এলাকার সামগ্রিক বা জোনভিত্তিক অনুমোদনযোগ্য ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ফলে রাজধানীর যাত্রী ও চালকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ট্রাফিক বিভাগ কোন কোন সড়ককে ই-রিকশা চলাচলের জন্য অনুমোদন দেয়। সেই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে রাজধানীর কোন এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলতে পারবে।