বিশ্বের চিন্তাচেতনা এবং মানবজীবনকে আমূল বদলে দেওয়া ১০০টি কালজয়ী বইয়ের একটি তালিকা তৈরি করেছেন ‘ওয়ান হানড্রেড বুকস দ্যাট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড’–এর লেখক। সেই বিশেষ সংকলন থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিক লেখাটি। যার অনুবাদ করেছেন নূরুননবী শান্ত।
তিন হাজার বছরেরও বেশি দীর্ঘ সময় ধরে ইহুদি সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রধান নির্দেশিকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ‘তোরাহ’ গ্রন্থটি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই গ্রন্থটি ‘তাওরাত’ নামেই অধিক পরিচিত। মূলত এই গ্রন্থের শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে ইহুদিদের আইনকানুন এবং সামগ্রিক জীবনধারা। ইহুদি পণ্ডিতদের মতে, এই পবিত্র বইটির মূল কথা হলো—‘প্রতিবেশীদের তেমনটাই ভালোবাসো, যেমন ভালোবাসো নিজেকে।’
‘তোরাহ’ মূলত পাঁচটি ভিন্ন বইয়ের একটি সমন্বিত রূপ, যেগুলি হলো—‘বেরেশিত’, ‘শেমোত’, ‘ভায়ইক্রা’, ‘বামিদবার’ ও ‘দেবারিম’। এই পাঁচটি বই খ্রিষ্টীয় ‘বাইবেল’–এর প্রথম পাঁচটি বইয়ের সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ, যেগুলি যথাক্রমে—‘জেনেসিস’, ‘এক্সোডাস’, ‘লেভিটিকাস’, ‘নাম্বারস’ ও ‘ডিউটারোনমি’। এই গ্রন্থগুলোতে মানবজাতির আদি উৎসস্থল হিসেবে ইডেন উদ্যানের কথা বলা হয়েছে এবং ইসরায়েল গোত্রের আদি নেতা ইব্রাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুব সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মুসার নেতৃত্বে ইসরায়েলিদের মিসর ত্যাগ করে সিনাই পর্বতে পৌঁছানোর দীর্ঘ কাহিনি এখানে বর্ণিত। একই সাথে ‘দশ আদেশ’সহ (টেন কমান্ডমেন্টস) ‘তোরাহ’ নাজেল হওয়ার ঘটনাপ্রবাহ, বিভিন্ন নির্দেশ এবং সেই আদেশগুলো অমান্য করার শাস্তির কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। মুসার মৃত্যু এবং ঈশ্বর–প্রতিশ্রুত কেনানে প্রবেশের আগে ইসরায়েলিদের তৎকালীন পরিস্থিতির বর্ণনার মাধ্যমে ‘তোরাহ’র সমাপ্তি ঘটে।
হিব্রু ভাষায় ‘তোরাহ’ শব্দের অনুবাদ করা হয় ‘আইন’ হিসেবে, তবে এই শব্দটির প্রকৃত ও গভীর অর্থ হলো ‘নির্দেশনা’ বা ‘শিক্ষা’। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, ইহুদিরা যে ‘তোরাহ’র অনুসারী, তার অর্থ হলো ঈশ্বরের দেওয়া নির্দেশনা অথবা মুসার শিক্ষা। ইহুদিদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, এই পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বেই ‘তোরাহ’ বিদ্যমান ছিল। ঈশ্বর এটি সব জাতির জন্যই নাজিল করেছিলেন, তবে কেবল ইসরায়েল জাতিই তা গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩১২ সালে মুসার ওপর এটি নাজিল হয় এবং পরবর্তী ৩০ থেকে ৪০ বছরের দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি তা লিপিবদ্ধ করেন।
আধুনিক গবেষকদের মতে, এই পাঁচটি গ্রন্থ প্রকৃতপক্ষে বহু শত বছর ধরে বিভিন্ন লেখকের হাতে রচিত হয়েছিল এবং খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ সালের দিকে সবগুলোকে একত্রে করে ‘তোরাহ’ হিসেবে প্রকাশিত করা হয়। কট্টর ইহুদিদের কাছে এটি ঈশ্বরের কঠোর আইন হিসেবে গণ্য হলেও উদারপন্থী ইহুদিরা একে একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করেন। যেমন অনেক খ্রিষ্টান ‘বাইবেল’–এর প্রতিটি কথাকে আক্ষরিকভাবে সত্য বলে মনে করেন না। ইসলাম ধর্মও ‘তোরাহ’র ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে স্বীকার করে। পবিত্র কোরআনে একাধিকবার ‘তোরাহ’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি মানুষের অবহেলায় বিকৃত হয়েছে; যুগে যুগে লিপিকারেরা নিজেদের মতো করে লিখতে গিয়ে এই বিকৃতি ঘটিয়েছেন।
বর্তমান যুগেও ‘তোরাহ’ চামড়ার স্ক্রলে হাতে লিখে লিপিবদ্ধ করার ঐতিহ্য বজায় আছে। ঐতিহ্যগত নিয়ম অনুযায়ী, ‘তোরাহ’র ৩ লাখ ৪ হাজার ৮০৫টি হিব্রু অক্ষরের প্রতিটির সঠিকতা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হয়। এটি একটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া, যা গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ক্যালিগ্রাফিক শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। নির্দিষ্ট শৈলী ও অক্ষররীতির কঠোর নিয়ম মেনে একটি ‘তোরাহ’ লেখা সম্পন্ন করতে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগে।
ইহুদি ধর্মের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, প্রত্যেক ইহুদির কাছে এক কপি ‘তোরাহ’ থাকা প্রয়োজন। কমপক্ষে দুই হাজার বছর ধরে ইহুদিরা একটি নির্ধারিত বার্ষিক পাঠ্যসূচি মেনে ‘তোরাহ’ বারবার শ্রবণ বা পাঠ করে আসছেন। তবে ‘তোরাহ’ কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থই নয়, এটি প্রাচীন ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। হিন্দুধর্ম ও জরাথুস্ত্রিয়ানের মতোই, ‘তোরাহ’ হলো পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্বাসব্যবস্থার প্রতিফলন।