বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা অতিরিক্ত দিয়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের। এই অনিয়ম দূর না করেই আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর ফলে রান্নার গ্যাসের খরচ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গত বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী একটি গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। এই শুনানিতে আমদানিকারক, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতারা তাদের কমিশনের পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানান। এসব প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে কমিশনের কারিগরি কমিটি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩৯ টাকা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশ কার্যকর হলে বর্তমানে নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা।

অভিযোগ উঠেছে যে, কমিশন মূলত নিয়ম রক্ষার জন্যই তাড়াহুড়ো করে দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছে এবং দাম সম্ভবত আগেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। এতে সাধারণ ভোক্তার জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত হয়নি। শুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে কমিশন ৬০ দিন সময় পেলেও আগামী রোববারের মধ্যেই মতামত জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো, শুনানির পর মতামত দেওয়ার জন্য হাতে থাকছে মাত্র একটি কার্যদিবস। উল্লেখ্য, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখে গত ১৪ অক্টোবর এই শুনানির ঘোষণা দেয় বিইআরসি। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের অভিযোগ, বাজারে বাড়তি দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কমিশন দ্রুত দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

নভেম্বরে নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের কারণেও দাম বাড়তে পারে। বিইআরসি ও আমদানিকারক সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম এবং জাহাজভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু নিয়মিত সমন্বয়েই ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১০০ টাকার বেশি বাড়তে পারে। এর সাথে বাড়তি কমিশন যুক্ত হলে ভোক্তার ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

তবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, শুনানিতে আসা সবার মতামত বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ সব সময়ই আসে। তবে কখনো কম দামেও বিক্রি হয়েছে। কমিশনসহ খরচের দিকগুলো ২০২১ সালে নির্ধারিত হওয়ায় এখন তা পরিবর্তন হতে পারে।”

গত দেড় মাস ধরে এলপিজি বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। অক্টোবরের শুরুতে একবার দাম বাড়ানো হলেও বাজারে বাড়তি দামে বিক্রি থামেনি। দেশে এলপিজি ব্যবসার সাথে যুক্ত ৩৫টি কোম্পানির মধ্যে ২৩টির আমদানির অবকাঠামো থাকলেও গত মাসে মাত্র ১০টি কোম্পানি আমদানি করেছে।

বর্তমানে কোম্পানিগুলো প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে মজুত ও বোতলজাত করার খরচ বা কমিশন পায় ২০০ টাকা। ওমেরা এই কমিশন বাড়িয়ে ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেলটা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে, পরিবেশকেরা কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন জানিয়েছেন। এছাড়া পরিবহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের জন্য প্রতি লিটারের কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এলপিজি বাজারের ৯৯ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে এবং এর ৮০ শতাংশ রান্নায় ব্যবহৃত হয়। এক কোটির বেশি গ্রাহক এই গ্যাস ব্যবহার করেন। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করলেও ক্রেতাদের প্রায়ই নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়।

প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে বিইআরসির কারিগরি কমিটি জানিয়েছে, ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম হতে পারে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা, যা বর্তমান দামের চেয়ে ১৩৯ টাকা বেশি। এর মধ্যে পরিবেশক পর্যায়ে কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা ধরা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, যৌক্তিক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ না করলে বাজার স্থিতিশীল হবে না। তারা জানান, এটি আকস্মিক দাবি নয়, বরং দুই বছর ধরে বিইআরসিকে জানানো হচ্ছে এবং এক বছর আগে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতির চাপে পড়ে বিইআরসি এখন শুনানি আয়োজন করেছে। তাদের মতে, আমদানিকারকদের জন্য ১০০ টাকা, পরিবেশকদের কমিশন ৭০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ১০৫ টাকা বাড়াতে হবে। সব মিলিয়ে ২৭৫ টাকা বাড়ালে আর কেউ বাড়তি দামে বিক্রি করবে না।

মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, “সব বিবেচনায় নিয়ে এমন দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকা বেশি বাজারে কেউ নিতে না পারে। তাই দাম অবশ্যই যৌক্তিক হতে হবে। এরপর বাজারে যেকোনো ব্যত্যয়ের জন্য সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।”

পরিবেশকদের পক্ষে মেসার্স উজ্জ্বল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মণি মুক্তা পাল বলেন, “অপারেটররা যেসব খরচ বাড়ার কথা বলেছে, তাদের মতো পরিবেশকদেরও খরচ বেড়েছে। একই সঙ্গে অলস সিলিন্ডারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে।” তিনি প্রতি সিলিন্ডারে কমিশন ১৫০ টাকা করার দাবি জানান।

অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা জানান, দুই লাখের বেশি গাড়ি এলপিজি দিয়ে চলে। ২০২১ সালে প্রতি লিটারে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারিত হয়েছিল, যা পাঁচ বছর ধরে অপরিবর্তিত। পরিচালন খরচ বাড়ায় ৮০ শতাংশ স্টেশন লোকসানের মুখে রয়েছে। তিনি কমিশন ১১ টাকা করার দাবি জানান।

ঋণপত্র জটিলতায় আমদানি করতে না পারা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ওরিয়ন গ্যাস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার অনুপ কুমার সেন বলেন, নতুন বাস্তবতায় ১০টি কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না, ফলে তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে আছে এবং বাজারে সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য কোম্পানির কাছ থেকে কিনে বিইআরসির দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।

দাম বাড়ানোর এই গণশুনানিতে আমদানিকারক ও বিইআরসি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। সরকার ঘোষিত দামে গ্যাস না পাওয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ভোক্তারা প্রশ্ন তোলেন। পরিবেশক আবু তাহের কোরেশি বলেন, “বোতলজাতকৃত এলপিজি পরিবেশকের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু যখনই সংকট শুরু হয়, তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে বাড়তি খরচ যোগ হয়, নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না।”

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রতিনিধি সৈয়দ মিজানুর রহমান জানান, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি, অতিরিক্ত চার্জ আদায় এবং এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে অর্থনীতি সমিতি এই শুনানি বর্জন করেছে।

আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর দাবি, প্রতি মাসে সমন্বয়ের সময় সৌদি কার্গো মূল্য, প্রিমিয়াম (জাহাজভাড়া, বিমা), ডলারের দর ও জ্বালানি তেলের দাম ধরে বিইআরসি দাম নির্ধারণ করে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে অন্যান্য খরচও বেড়েছে, তাই দাম পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের প্রতিনিধি খলিলুর রহমান ৭ দফা লিখিত দাবি পেশ করেন। তিনি বলেন, গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা বিইআরসির দায়িত্ব, তা না হলে এই শুনানি সঠিক হবে না। তিনি দাম না বাড়ানো এবং বিইআরসি ঘোষিত দরে বেচাকেনা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বাজারে ইচ্ছেমতো দামে এলপিজি বিক্রি করে আবার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে কোম্পানিগুলো। বাড়তি দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাড়াহুড়া করে দাম বাড়িয়ে কমিশন মূলত নিয়ম রক্ষার ভূমিকায় আছে। দাম আসলে আগেই নির্ধারণ করে রেখেছে। এতে ভোক্তার জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত হয়নি।”