তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ‍্যাসের (এলপিজি) বাজারে গত দেড় মাস ধরে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ ভোক্তারা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই এলপিজি বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর জোরালো দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারক, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতারা। তিন পক্ষের এই দাবিগুলো খতিয়ে দেখতে এবং কমিশন বৃদ্ধির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একটি গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এই গণশুনানির আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন আমদানিকারক কোম্পানি ও পরিবেশকেরা উপস্থিত হয়ে তাঁদের প্রস্তাবনা পেশ করেন। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে আমদানিকারকেরা ৩০০ টাকার বেশি এবং পরিবেশকেরা ১৫০ টাকা কমিশন করার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছেন।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে সক্রিয় ৩৫টি কোম্পানির মধ্যে এলপিজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি কোম্পানির। তবে গত মাসে মাত্র ১০টি কোম্পানি আমদানি কার্যক্রম চালিয়েছে। আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর মধ্যে কেউ কেউ তাদের প্রস্তাবে কমিশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর দাবি করেছেন। ১২ কেজির সিলিন্ডারে বর্তমান ২০০ টাকার কমিশন বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা এবং ডেল্টা ৩৬০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে। তবে মেঘনা গ্রুপ সবচেয়ে কম অর্থাৎ ৩০০ টাকা কমিশন করার প্রস্তাব দিয়েছে।

অন্যদিকে, পরিবেশকেরা বর্তমান ৫০ টাকা কমিশন বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন জানিয়েছেন। এছাড়া পরিবহনে ব্যবহৃত অটোগ‍্যাসের প্রতি লিটারের কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, “মধ‍্যপ্রাচ‍্য যুদ্ধের আগে জাহাজভাড়াসহ প্রিমিয়াম ছিল প্রতি টনে ৮০ থেকে ১২০ ডলার। এটি এখন ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে ঠেকেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে। সব বিবেচনায় নিয়ে এমন দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকা বেশি বাজারে কেউ নিতে না পারে।”

উল্লেখ্য, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখে তড়িঘড়ি করে এই গণশুনানির আয়োজন করেছে বিইআরসি। এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। তবে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর ১৪ অক্টোবর তারা সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয় এবং ঠিক সেই দিনই গণশুনানির ঘোষণা দেওয়া হয়।

এলপিজি বাজারের ৯৯ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। বিইআরসি ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে একটি নির্দিষ্ট সূত্রের মাধ্যমে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করে আসছে। তবে বাস্তবে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হয় না; গ্রাহকদের প্রায়ই বাড়তি দাম দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়। চলতি মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হলেও সাধারণ গ্রাহকরা তা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

আমদানি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও যারা আমদানি করতে পারছেন না, তাদের পক্ষ থেকে ওরিয়ন গ‍্যাস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার অনুপ কুমার সেন বলেন, “নতুন বাস্তবতায় ১০টা কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না। তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে বাজারে সিলিন্ডার–সংকট তৈরি হয়েছে। অন‍্য কোম্পানির কাছ থেকে কিনে নিয়ে বিইআরসির দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাই পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানান তিনি। তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট কমবে ও অন‍্যায‍্য দাম নেওয়া বন্ধ হবে।”

পরিবেশকদের পক্ষ থেকে মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনি মুক্তা পাল বলেন, “অপারেটররা যেসব খরচ বাড়ার কথা বলেছে, তাদের মতো পরিবেশকদেরও খরচ বেড়েছে। এক সঙ্গে অলস সিলিন্ডারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। পরিবেশকদের কমিশন প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা করার দাবি করেন তিনি। তিনি এ বিষয়ে বলেন, এই দাবি পূরণ না হলে বাজারে দাম কমবে না।”

অটোগ‍্যাস সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা জানান, বর্তমানে দুই লাখের বেশি গাড়ি এলপিজি দিয়ে চলে। ২০২১ সালে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। পরিচালন খরচ বৃদ্ধির ফলে রাজশাহীর সাদ স্টেশনে মাসে ৪৫ হাজার টাকা ক্ষতি হচ্ছে। শহরের কিছু স্টেশন মুনাফা করলেও ৮০ শতাংশ স্টেশন লোকসানের মুখে রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে তিনি কমিশন ১১ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান।

সবার প্রস্তাবনা মূল‍্যায়ন করে বিইআরসি গঠিত কারিগরি কমিটি শুনানিতে প্রতিবেদন উপস্থাপন করছে। এরপর এসব প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত যুক্তিতর্ক চলবে এবং শুনানি শেষে খুব শিগগিরই চূড়ান্ত আদেশ ঘোষণা করতে পারে বিইআরসি।