দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মূল্যে পণ্যটি পাচ্ছেন না সাধারণ ভোক্তারা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আমদানিকারক, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে একটি গণশুনানির আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আমদানিকারকদের একাংশ তাদের কমিশন আড়াই গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন, অন্যদিকে পরিবেশকদের দাবি কমিশনের পরিমাণ তিন গুণ করা হোক।
আগামী বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত সভায় ব্যবসায়ীদের submitted প্রস্তাবগুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে।
বিইআরসিতে জমা দেওয়া আবেদনপত্রের তথ্যানুসারে, বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য আমদানিকারকদের কমিশন নির্ধারিত রয়েছে ১৯১ টাকা। এই অঙ্ক বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবেশকেরা তাদের বর্তমান কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন জানিয়েছেন।
নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি
গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে এলপিজি বাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সে সময় চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়ার কথা উল্লেখ করে বিক্রেতারা প্রতি সিলিন্ডারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করতে শুরু করেন। এর ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গ্যাসের তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং সাধারণ ভোক্তারা চরম ভোগান্তির শিকার হন।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার শুল্ক হ্রাস, আমদানির সীমা বৃদ্ধি এবং ঋণপত্র বা এলসি খোলার প্রক্রিয়া সহজ করার মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তবে এসব উদ্যোগের পরেও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। গত তিন মাস ধরে আবারও এলপিজির দাম নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এক মাসের ব্যবধানে দুই দফায় দাম বাড়ানো হলেও ভোক্তারা নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পর্যাপ্ত আমদানি থাকা সত্ত্বেও গত সেপ্টেম্বর থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার অন্তত ১ হাজার টাকা বাড়িয়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি শুরু হয়।
অক্টোবরে বিইআরসি ভোক্তাপর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাজারে সিলিন্ডারের বিক্রয়মূল্য ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
চাহিদার চেয়েও বেশি আমদানি
বাংলাদেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। বিপরীতে গত আগস্টে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অক্টোবরেও আমদানির পরিমাণ একই স্তরে থাকতে পারে।
অর্থাৎ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমদানির পরিমাণ দেশের মাসিক চাহিদার চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়া সত্ত্বেও বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার বিষয়টি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘটের উদ্যোগ
কমিশন বৃদ্ধির দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। তবে সরকারের কঠোর অবস্থানের ঘোষণা এবং বিইআরসি কর্তৃক গণশুনানির তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর তারা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়।
দেশে এলপিজি আমদানির জন্য মোট ৩০টি কোম্পানি নিবন্ধিত থাকলেও বর্তমানে মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে নিজস্ব প্ল্যান্টে বোতলজাত করার কাজে যুক্ত রয়েছে ১২টি প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর একসময় বাজারে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা বসুন্ধরা ও বেক্সিমকো গ্রুপের এলপিজি ব্যবসা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
কমিশনের ইতিহাস
২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া চালু করে বিইআরসি। সে সময় ১২ কেজির সিলিন্ডারে কমিশন ধরা হয়েছিল ১৪৩ টাকা। পরবর্তীতে আমদানিকারক ও অপারেটরদের দাবির প্রেক্ষিতে তা বাড়িয়ে প্রথমে ১৮৬ টাকা এবং পরে ১৯১ টাকা করা হয়।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও কয়েক দফায় কমিশন বা মুনাফার হার বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন আমদানিকারকেরা। তবে তৎকালীন সময়ে তাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার আবারও কমিশন বাড়ানোর দাবি নিয়ে সক্রিয় হয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এখন বিইআরসির এই গণশুনানিতে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় এবং কমিশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সাধারণ ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির দাম ও সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনায় কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।