তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য নিয়মিতভাবে নির্ধারণ করা হলেও সাধারণ ভোক্তারা সেই নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। উদাহরণস্বরূপ, অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তব বাজারে এর দাম ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। মূল্য সমন্বয়ের পর দাম বাড়ানো হলেও বাজারে সরবরাহসংকট দূর হয়নি। ফলে সাধারণ ভোক্তারা একদিকে যেমন বাড়তি মূল্য পরিশোধ করছেন, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, সরকারি মূল্য নির্ধারণের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষ আদৌ পাচ্ছেন কি না।

বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ এলপিজি ব্যবহার করছেন, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। আবাসিক এলাকায় নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য পরিবার এখন এই জ্বালানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাই এলপিজির সংকটকে কেবল একটি সীমিত ব্যবসায়িক সমস্যা হিসেবে দেখা ভুল; এটি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং পারিবারিক বাজেটের সঙ্গে জড়িত। নির্ধারিত দামের চেয়ে একটি সিলিন্ডারের জন্য অতিরিক্ত ৬০০ টাকার বেশি ব্যয় করতে হলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে তাদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমদানি ও সরবরাহের হিসাবের মধ্যে যে অসংগতি রয়েছে, তা দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরি। আমদানিকারকদের সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি স্বাভাবিক ছিল। তবে পরিবেশকদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন; তারা বলছেন, মাত্র ছয়টি কোম্পানি নিয়মিত সরবরাহ করছে এবং তাদের কাছেও চাহিদামতো গ্যাসের মজুদ নেই। যদি আমদানি স্বাভাবিক থাকে, তবে বাজারে এই ঘাটতির কারণ কী? আমদানি পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত এলপিজি কোথায় আটকে থাকছে, কোন কোম্পানি কতটুকু সরবরাহ করছে এবং মজুতের প্রকৃত অবস্থা কী—এই প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া প্রয়োজন।

জ্বালানি বিভাগ এবং বিইআরসি-র উচিত আমদানি, মজুত এবং বাজারে ছাড়ার তথ্যের সমন্বয় করে সংকটের মূল উৎস শনাক্ত করা। পরিবহন বা বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি থাকলে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি, কোনো প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরবরাহ সীমিত রেখে বাড়তি দাম আদায়ের চেষ্টা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো পক্ষের একতরফা বক্তব্যকে যাচাই-বাছাই ছাড়া সংকটের পূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা সমীচীন হবে না।

অন্যদিকে, পরিবেশকদের ব্যয় বৃদ্ধির দাবিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাঁচ বছর আগে নির্ধারিত কমিশন বর্তমান পরিবহন, শ্রম ও পরিচালন ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনার যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি যাচাই করা আর নির্ধারিত মূল্য অমান্য করার অনুমতি দেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কমিশন কম হওয়ার অজুহাতে ইচ্ছামতো দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আবার বাস্তব ব্যয় উপেক্ষা করে এমন মূল্যকাঠামো বহাল রাখাও উচিত নয়, যা কার্যকর করা সম্ভব হয় না। যদি কোম্পানিগুলো নির্ধারিত পাইকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বাজারে ছাড়ে, তবে কেবল পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। মূল্যশৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

এলপিজি খাতের ৯৯ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করার চূড়ান্ত দায়িত্ব সরকারের। বাজারে জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা, আমদানির পরিমাণ এবং কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কোম্পানিভেদে অযৌক্তিক মূল্যপার্থক্য এবং সরবরাহ সংক্রান্ত অস্পষ্টতা দূর করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। ভোক্তা যাতে স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়ার তথ্য পান এবং অভিযোগ জানানোর সহজ সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। এলপিজি বাজারকে পুরোপুরি বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারের উচিত বিপিটির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আমদানি করা।

ব্যবসায়ীদের পণ্য বিক্রি বন্ধ রাখার চিন্তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কর্তৃপক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবির নিষ্পত্তি করতে হবে এবং সরবরাহ সচল রাখতে হবে। তবে চাপের মুখে পড়ে যাচাইহীন ব্যয়ভার ভোক্তার ওপর চাপানো চলবে না। সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।