সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) মব সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালককে মারধরের ঘটনাটি কেবল নিন্দনীয়ই নয়, বরং অত্যন্ত গভীর উদ্বেগের বিষয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা এই সংস্থাটি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশে সংক্রামক রোগের নজরদারি, প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধান, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা এবং সাধারণ নাগরিকদের সচেতন করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে দেশে করোনা মহামারির ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই প্রতিষ্ঠানটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। এমতাবস্থায়, এমন একটি প্রতিষ্ঠানে মব সৃষ্টির ঘটনা শুধু যে রোগনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় তা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মুক্তকণ্ঠের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বুধবার সকালে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত আইইডিসিআরের নিজস্ব কার্যালয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে একটি সভা করছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকি। ঠিক সেই সময়েই বিএনপিপন্থী চিকিৎসক সংগঠন ড্যাবের কয়েকজন নেতা ও কর্মী সেখানে গিয়ে হামলা চালান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, পরিচালককে চেয়ার থেকে টেনেহিঁচড়ে তুলে কয়েকজন মিলে মারধর করছেন। সভায় উপস্থিত জনস্বাস্থ্যবিদদের অভিযোগ, যাঁরা এই মারধরের ঘটনায় জড়িত ছিলেন, তাঁদের আগে কখনো আইইডিসিআরে দেখা যায়নি।
কাজী আহমেদ জাকি একজন অভিজ্ঞ জনস্বাস্থ্যবিদ। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে আইইডিসিআরের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করছেন। মব সৃষ্টি ও এই হামলায় যে আট থেকে নয়জন ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ড্যাবের কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সহসম্পাদক। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ড্যাব একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই ব্যক্তির প্রাথমিক সদস্য পদ স্থগিত করার কথা জানিয়েছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আমরা প্রত্যাশা করি, তদন্ত কমিটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে দায়দায়িত্ব নিরূপণ এবং যথাযথ সুপারিশসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করবে। তবে আইইডিসিআরে যে মব-সহিংসতা এবং পরিচালককে মারধরের ঘটনাটি ঘটেছে, তা স্পষ্টভাবে একটি ফৌজদারি অপরাধ। এ ধরনের গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কেবল সদস্য পদ স্থগিত করা কিংবা সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা কোনোভাবেই চূড়ান্ত শাস্তি হতে পারে না। এই হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধে বিচার করতে হবে। এ রকম নিন্দনীয় ঘটনার পেছনে কারও ইন্ধন আছে কি না, সেটাও তদন্ত করে বের করে আনতে হবে।
ড্যাবের সভাপতি আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার সঙ্গে বর্তমান পরিচালকের বৈঠক নিয়ে যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইইডিসিআরের পরিচালক কাদের সঙ্গে সভা করবেন, তা তদারকি করার দায়িত্ব ড্যাবের নয়।
সম্প্রতি মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আইনের শাসন এবং স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ওপর বিএনপি সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল। সেই ঘটনায় সরকার সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়। এটি নিঃসন্দেহে অপকর্মে লিপ্ত নেতা-কর্মীদের প্রতি সরকারের একটি কঠোর বার্তা। আমরা আশা করি, আইইডিসিআরে মব সৃষ্টির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। মব-সহিংসতার দিন শেষ—এটি শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে।