প্রথম দিন শেষে ৩ উইকেটে ২১৩ রান। সাদমান ইসলাম অপরাজিত ৯৯ রানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে বড় সংগ্রহের স্বপ্ন দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের সকালে সব হিসাব বদলে গেল। মাত্র ৫৯ রান যোগ করতেই শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে ২৭২ রানে অলআউট স্বাগতিকরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেঞ্চুরি পেলেও দলের এমন ব্যাটিং বিপর্যয়ে হতাশ সাদমান। তার আক্ষেপ, টপ অর্ডারের ব্যাটাররা ইনিংস আরও বড় করতে পারলে বাংলাদেশের সংগ্রহ পৌঁছাতে পারত ৪৫০ থেকে ৫০০ রানে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসেন সাদমান। ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়েই বেশি কথা বলেন বাঁহাতি এই ওপেনার। নিজেদের ভুলের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ভালো বোলিংয়ের কথাও স্বীকার করেন তিনি।
প্রথম দিনের ৯৯ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিন ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম ওভারেই সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন সাদমান। জশুয়া বিশপের করা দিনের দ্বিতীয় বল থেকে দুই রান নিয়ে ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট শতকের দেখা পান তিনি। তবে এরপর ইনিংস খুব বেশি এগিয়ে নিতে পারেননি। ২৩৪ বলে ১১ চারে ১০৫ রান করে বিশপের বলেই এলবিডব্লিউ হন সাদমান। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি তিনি।
তার বিদায়ের পর দ্রুত ফিরে যান আগের দিন চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া তাওহীদ হৃদয়ও। ৪২ রানের সঙ্গে আর কোনো রান যোগ করতে পারেননি তিনি। অভিষিক্ত স্পিনার বিশপের বলে বোল্ড হন হৃদয়। এরপর লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও শেষ পর্যন্ত বড় সংগ্রহের সুযোগ হাতছাড়া হয় বাংলাদেশের।
ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে সাদমান বলেন, ‘অবশ্যই এখানে আমাদের আরও ভালো করা উচিত। আমরা টপ অর্ডাররা যদি স্কোরটা আরেকটু বড় করতে পারতাম, ১৫০, ১৭০ বা ২০০ হতো, তাহলে হয়তো দলের রান ৪৫০-৫০০-তে যেত। আমাদের ভুল হয়ে গেছে। চেষ্টা থাকবে, ইনশাআল্লাহ, পরেরবার এরকম পরিস্থিতি এলে যত বড় করা যায়।’
নিজের ইনিংস আরও বড় করতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে লিটনের সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশকে ভালো অবস্থানে নেওয়ার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন সাদমান।
তার ভাষায়, ‘সকালবেলা আমাদের আর্লি উইকেটটা পড়ে। আমি আর লিটন যখন ব্যাটিং করছিলাম, আমরা যদি বা আমি যদি কিছুক্ষণ খেলতে পারতাম, একটু বড় করতে পারতাম, তাহলে হয়তো পরিস্থিতিটা অন্য রকম হতো।’
মিরপুরের উইকেটে দিনের শুরু ও শেষ ভাগে ব্যাটারদের কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয় বলে জানিয়েছেন সাদমান। তবে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসের জন্য উইকেটকে দায় দিতে রাজি নন তিনি। বরং নিজেদের ভুল ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভালো বোলিংকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এই ওপেনার।
তাওহীদ হৃদয়ের আউট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাদমান বলেন, ‘না, উইকেটের জন্য এমন কিছু না। হৃদয় যে বলে আউট হয়েছে, মোটামুটি হাফভলি বল ছিল, যেটা মারার বল। হৃদয় এসব শট খেলে থাকে, এসব শটেই রান করে। আমার কাছে মনে হয় না তেমন কিছু। হয়তো ওরা ভালো বোলিং করেছে, আমাদেরও কিছু ভুল ছিল।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান। ৫৩ রানে ৫ উইকেট নিয়েছেন তিনি। অভিষিক্ত জশুয়া বিশপ ও শামার জোসেফ পেয়েছেন দুটি করে উইকেট। বাংলাদেশের হয়ে সাদমানের সেঞ্চুরির পাশাপাশি হৃদয়ের ৪২ ও লিটনের অপরাজিত ৩৪ রান ছাড়া আর কেউ বড় অবদান রাখতে পারেননি।
এদিকে প্রায় দেড় বছর পর টেস্টে সেঞ্চুরি পেলেন সাদমান। সবশেষ ২০২৫ সালের এপ্রিলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শতক করেছিলেন তিনি। এরপর বেশ কয়েকবার ভালো শুরু করলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। বিশেষ করে অর্ধশতক কিংবা ৭০ রানের ঘরে পৌঁছে আউট হওয়ার প্রবণতা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে তাঁর।
তবে এসব সমালোচনাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না বলে জানিয়েছেন এই ওপেনার। নিজের উন্নতির জন্য অনুশীলন ও পরিশ্রমেই মনোযোগ রাখতে চান তিনি।
সাদমান বলেন, ‘সমালোচনা আসবেই। আমি এসব নিয়ে খুব কম চিন্তা করি। আমার কাজ খেলা, প্র্যাকটিস করা, হার্ডওয়ার্ক করা। আমি সব সময় এই প্রক্রিয়ায় থাকার চেষ্টা করি।’
কেন ভালো শুরু করার পরও বড় ইনিংস খেলতে পারছিলেন না, সেই সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন সাদমান নিজেও। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিটনেস নিয়েও আলাদাভাবে কাজ করেছেন তিনি। নিজের প্রস্তুতিতে সাবেক ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল ও বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের পরামর্শও কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন।
নিজের প্রস্তুতি সম্পর্কে সাদমান বলেন, ‘আমি সব সময় চিন্তা করতেছিলাম, কেন এইটুকু জায়গায় গিয়ে আউট হয়ে যাচ্ছি। শেষ কিছুদিন এটা নিয়ে অনেক কাজ করেছি। আমার কাছে মনে হচ্ছিল ফিটনেসের সমস্যা হতে পারে। তাই ফিটনেস নিয়ে কাজ করেছি। ব্যাটিংয়েও কিছু ঘাটতি ছিল। আশরাফুল ভাই, সালাহউদ্দিন স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি।’
ওপেনার হিসেবে শুধু নিজের রান নয়, দলের জন্য বড় জুটি গড়ার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাদমান। নতুন বল ভালোভাবে সামলাতে পারলে পরের ব্যাটারদের কাজ সহজ হয়ে যায়। তাই ইনিংসের শুরুতে ধৈর্য ধরে ব্যাটিং করার পাশাপাশি ভালো উদ্বোধনী জুটি গড়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে আগের দিন ৯৯ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়লেও সেঞ্চুরি নিয়ে বাড়তি চাপ অনুভব করেননি সাদমান। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল পরদিন আবার ব্যাটিংয়ে নেমে ইনিংস বড় করা।
তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটে এরকম আসবেই। ৯৯ রান নিয়ে মানুষ বলতেছিল, কিন্তু আমার মনে এরকম কিছু আসে নাই। আমার চিন্তা ছিল পরদিন গিয়ে কীভাবে একটু বড় করে দলের জন্য ভালো খেলা যায়।’
এদিকে বাংলাদেশের ২৭২ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে ৪ উইকেটে ১৩৪ রান করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবীয়রা এখনো ১৩৮ রানে পিছিয়ে। জন ক্যাম্পবেলের ৫৪ রানের ইনিংসে ভালো অবস্থানে পৌঁছালেও শেষ সেশনে দ্রুত তিন উইকেট হারায় সফরকারীরা। এর মধ্যে তাইজুল ইসলাম এক ওভারেই দুটি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরান।
তৃতীয় দিনের শুরুতেই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার আশা করছেন সাদমান। তার মতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাকি উইকেটগুলো দ্রুত তুলে নিয়ে প্রথম ইনিংসে যতটা সম্ভব বড় লিড নিশ্চিত করতে হবে।
সাদমান বলেন, ‘যত লিড নেওয়া যায়, তত আমাদের জন্য ভালো। যেভাবে বোলিং হচ্ছে, কাল সকালে যদি দ্রুত উইকেট নিতে পারি, ভালো বল করতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি অলআউট করার চেষ্টা থাকবে।’