বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের কিশোর ফুটবলারদের দুর্দান্ত জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। আগের দুটি ম্যাচে টাইব্রেকারের চরম উত্তেজনা ও স্নায়ুর লড়াই পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। তবে এবারের ম্যাচে তাদের আর পেনাল্টি শুটআউটের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়নি। ইউরোপীয় দেশ মন্টেনেগ্রোকে একেবারে বিধ্বস্ত করে দাপুটে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। পাভেল হাসানের জোড়া গোলের সৌজন্যে ৪-০ ব্যবধানের এই বিশাল জয় তুলে নিয়ে ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালের ‘ই’ টায়ারের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের কিশোররা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আজারবাইজানের রাজধানী বাকুর হোভসান কম্পিটিশন কমপ্লেক্সের ৩বি নম্বর মাঠে এই কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে বাংলাদেশ। দলের এই বড় জয়ে দুটি গোল করেছেন পাভেল হাসান। এছাড়া মোহাম্মদ বায়েজিদ ও শিবাক কুমার মালির করা গোলে ব্যবধান আরও বাড়ে। প্রথমার্ধে এক গোলে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে আরও তিনবার প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠায় বাংলাদেশের কিশোররা।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে বাংলাদেশ এবং দ্রুতই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। নবম মিনিটেই ডি-বক্সের বাইরে থেকে একটি জোরালো শটে মন্টেনেগ্রোর জালে বল জড়ান বায়েজিদ। তার এই গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
এগিয়ে যাওয়ার পর ব্যবধান আরও বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়েছে বাংলাদেশ, তবে প্রথমার্ধে আর কোনো গোল আসেনি। অন্যদিকে, সমতায় ফেরার জন্য বেশ কিছু চেষ্টা করলেও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় মন্টেনেগ্রো। ফলে ১-০ গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় বাংলাদেশের কিশোররা।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ। এবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় পাভেল হাসানকে। ম্যাচের ২৪ মিনিটে একটি চমৎকার গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন তিনি। দ্বিতীয় গোলের পর মন্টেনেগ্রোকে আর ম্যাচে ফেরার কোনো সুযোগই দেয়নি বাংলাদেশ।
ম্যাচের ৩৪ মিনিটে তৃতীয় গোলটি করেন শিবাক কুমার মালি। তার গোলের মাত্র দুই মিনিট পর আবারও প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠান পাভেল। ৩৬ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের চতুর্থ গোলটি করে বড় জয় নিশ্চিত করেন এই তরুণ ফুটবলার।
শেষ পর্যন্ত কোনো গোল হজম না করেই ৪-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। এই জয়ের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার নকআউট পর্বে টানা তৃতীয় ম্যাচ জিতল বাংলাদেশের কিশোররা। একই সঙ্গে ‘ই’ টায়ারের শেষ চার বা সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল তারা।
তবে এবারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পথচলা শুরু থেকে খুব সহজ ছিল না। গ্রুপ পর্বে পর্তুগাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিজি, বুরুন্ডি ও ওয়েলসের বিপক্ষে খেলেছে দলটি। প্রথম ম্যাচে ওয়েলসের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করার পর পর্তুগালের কাছে ৩-১ গোলে হেরে যায় বাংলাদেশ।
এরপর ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করলেও বুরুন্ডির বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে পরাজিত হয় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফিজিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে জয়ের ধারা ফিরে পায় বাংলাদেশ। পাঁচ ম্যাচে একটি জয়, দুটি ড্র ও দুটি হার নিয়ে ‘জি’ গ্রুপে পঞ্চম স্থান পায় দলটি।
গ্রুপ পর্বের অবস্থানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জায়গা পায় প্রতিযোগিতার ‘ই’ টায়ারের নকআউট পর্বে। সেখানে শেষ বত্রিশে প্রতিপক্ষ ছিল সিশেলস। নির্ধারিত ৪০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলে শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।
শেষ ষোলোতে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষেও একই ধরনের লড়াইয়ের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশের কিশোররা। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হয় ১-১ গোলে। এরপর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে মন্টেনেগ্রোও আগের দুই রাউন্ডে টাইব্রেকারে জয় পেয়েছিল। শেষ বত্রিশে মঙ্গোলিয়া ও শেষ ষোলোতে হংকংকে হারিয়ে বাংলাদেশের মুখোমুখি হয় ইউরোপের এই দলটি। তবে আগের দুই ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউটে জয় পেলেও বাংলাদেশের আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি তারা।
প্রথমবারের মতো আয়োজিত ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালে অংশ নিয়েছে মোট ১৮৯টি দল। প্রচলিত ফুটবল বিশ্বকাপের তুলনায় এই প্রতিযোগিতার নিয়ম ও কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে প্রতিটি দলে মাত্র আটজন ফুটবলার মাঠে নামেন। ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয় ২০ মিনিট করে দুই অর্ধে, অর্থাৎ মোট ৪০ মিনিট ধরে।
গ্রুপ পর্বের ফলের ভিত্তিতে দলগুলোকে ছয়টি আলাদা প্রতিযোগিতামূলক স্তর বা টায়ারে ভাগ করেছে ফিফা। প্রতিটি টায়ার থেকেই আলাদা চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করা হবে। তবে সর্বোচ্চ ‘এ’ টায়ারের বিজয়ী দলই প্রতিযোগিতার মূল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
বাংলাদেশ খেলছে পঞ্চম স্তর বা ‘ই’ টায়ারে। ফলে মন্টেনেগ্রোকে হারিয়ে এই স্তরের সেমিফাইনালে উঠেছে দলটি। অর্থাৎ পুরো প্রতিযোগিতার সেরা চার দলের একটি নয়, বরং নিজেদের নির্ধারিত স্তরের শেষ চারে জায়গা পেয়েছে বাংলাদেশ।
ফিফার এই বিশেষ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন দেশের তরুণ ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা দেওয়া। শুধু প্রতিযোগিতা নয়, ভিন্ন দেশের ফুটবলারদের সঙ্গে খেলাধুলা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করাও এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। আগামী শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) আজারবাইজানের বাকু ক্রিস্টাল হলে অনুষ্ঠিত হবে বিভিন্ন টায়ারের ফাইনাল ম্যাচগুলো।