ফিফার একটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সাফল্যের পথে এগিয়ে চলা। টানা দুই ম্যাচে টাইব্রেকারে জয়লাভ করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব–১৫ ফুটবল দল। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে বর্তমানে ফিফা অনূর্ধ্ব–১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালের প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই বিশেষ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশসহ মোট ১৮৯টি দেশের কিশোর ফুটবল দল অংশ নিয়েছে।

তবে এই টুর্নামেন্টের গঠন ও ধরন প্রচলিত বিশ্বকাপের চেয়ে বেশ আলাদা। এখানে কেবল একটি দলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে আয়োজন শেষ করা হয় না, বরং ছয়টি ভিন্ন স্তরে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিটি দল টুর্নামেন্টের শেষ দিন পর্যন্ত খেলার সুযোগ পায়।

কম বয়সী ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করাই ফিফার এই নতুন আয়োজনের মূল লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্য সফল করতে ম্যাচের দৈর্ঘ্য কমানো হয়েছে, মাঠের আকার ছোট করা হয়েছে এবং প্রচলিত ১১ জনের পরিবর্তে প্রতি দলে ৮ জন করে খেলোয়াড় খেলছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হলো বাছাইপর্বের ফলাফলের ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারীদের ছয়টি স্তরে ভাগ করা। বাংলাদেশ বর্তমানে সেই স্তরভিত্তিক প্রতিযোগিতার পঞ্চম স্তর বা টিয়ার ই-তে লড়াই করছে।

বাছাইপর্ব থেকে ছয় স্তরে

গত ২৪ অক্টোবর শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টটি দুটি ধাপে বিভক্ত—বাছাইপর্ব এবং মূল প্রতিযোগিতা পর্ব। বাছাইপর্বে দলগুলো বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে খেলেছে, যেখানে প্রতিটি দল চার থেকে পাঁচটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে। গ্রুপগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল এবং ভিন্ন মানের ফুটবল খেলা দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়।

বাছাইপর্বের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়েছে কোন দল পরবর্তী ধাপে কোন স্তরে খেলবে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়নরা জায়গা পেয়েছে টিয়ার এ-তে এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকারকারী দলগুলো টিয়ার বি-তে। এভাবে গ্রুপে অবস্থানের ক্রমানুসারে দলগুলোকে টিয়ার এ, বি, সি, ডি, ই এবং এফ—এই ছয়টি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী ধাপে কাছাকাছি মানের দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাছাইপর্বে বাংলাদেশ গ্রুপে পঞ্চম স্থান অধিকার করায় তাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে টিয়ার ই। এই স্তরে এখন নিজেদের সমান অবস্থানে থাকা অন্য গ্রুপের দলগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশের কিশোর ফুটবলাররা।

ছয় স্তরে ছয় চ্যাম্পিয়ন

দ্বিতীয় ধাপে প্রতিটি স্তরে আলাদা টুর্নামেন্টের মতো প্রতিযোগিতা চলছে। এখানে জয়ী দল পরবর্তী রাউন্ডে অগ্রসর হয়, তবে পরাজিত হয়েও টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় না। বরং একই স্তরে পরাজিত দলগুলো পরবর্তী ম্যাচে অন্য পরাজিত দলের মুখোমুখি হয়। এই বিশেষ ব্যবস্থার ফলে প্রতিটি দল শেষ দিন পর্যন্ত মাঠে নামার সুযোগ পাচ্ছে।

প্রতিটি স্তরের জন্য আলাদা চ্যাম্পিয়ন নির্বাচন করা হবে। তবে ছয় স্তরের ছয় চ্যাম্পিয়নের মধ্যে কেবল টিয়ার এ-এর বিজয়ী দলই ফিফা অনূর্ধ্ব–১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালের মূল চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে। তাই বাংলাদেশ যদি টিয়ার ই-তে চ্যাম্পিয়ন হয়, তবে তারা ওই স্তরের শিরোপা পাবে, মূল বিশ্বকাপের শিরোপা নয়। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো দল বাছাইপর্বে পিছিয়ে পড়লেও যেন তারা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ না হারায়। কিশোর ফুটবলারদের বেশি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা দেওয়া এবং তাদের উন্নতির পথ প্রশস্ত করাই ফিফার লক্ষ্য।

আটজনের দল, ৪০ মিনিটের ম্যাচ

টুর্নামেন্টের খেলার নিয়মেও আনা হয়েছে বেশ কিছু ব্যতিক্রম। প্রতি দলে গোলকিপারসহ মাত্র আটজন খেলোয়াড় মাঠে নামছে। ম্যাচের দুই অর্ধ ২০ মিনিট করে, অর্থাৎ নির্ধারিত মোট সময় ৪০ মিনিট। মাঠের আয়তনও প্রচলিত ফুটবল মাঠের চেয়ে ছোট। খেলোয়াড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এখানে 'রোলিং সাবস্টিটিউশন' নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে, যার ফলে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়ানো খেলোয়াড় পুনরায় মাঠে ফিরতে পারে। এছাড়া থ্রো-ইনের পরিবর্তে এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে কিক-ইন।

ছোট মাঠ, সীমিত খেলোয়াড় এবং কম সময়ের ম্যাচের উদ্দেশ্য হলো খেলোয়াড়দের বলের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া। এতে বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং একের পর এক আক্রমণ গড়ে তোলার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। কিশোর খেলোয়াড়দের শারীরিক ও কৌশলগত বিকাশের কথা মাথায় রেখেই ফিফা এই নিয়মগুলো প্রণয়ন করেছে।

আগামী ৩০ অক্টোবর শেষ হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টে প্রায় এক হাজারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। অধিকাংশ খেলা পরিচালিত হচ্ছে হোভসান কমপ্লেক্সে এবং টিয়ারগুলোর ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে বাকু ক্রিস্টাল হলে।

বাংলাদেশ কেমন খেলছে

বাছাইপর্বের গ্রুপ জি-তে পাঁচটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ওয়েলসের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের মাধ্যমে। তবে পর্তুগালের বিপক্ষে ৩–১ গোলে পরাজিত হয় দলটি। পরবর্তী ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ১–১ গোলে ড্র করে বাংলাদেশ। এরপর বুরুন্ডির কাছে ২–০ গোলে হারলেও শেষ ম্যাচে ফিজিকে ৩–১ গোলে হারিয়ে বাছাইপর্ব শেষ করে কিশোরেরা।

পাঁচ ম্যাচে একটি জয়, দুটি ড্র ও দুটি হারের ফলে বাংলাদেশের মোট পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ৫। গ্রুপে পঞ্চম হওয়ায় পরবর্তী পর্বে দলটির জায়গা হয়েছে টিয়ার ই-তে। তবে একই গ্রুপের অন্য দলগুলোর পথ ছিল ভিন্ন।

গ্রুপ জি-তে শীর্ষে থাকা ওয়েলস পাঁচ ম্যাচে চার জয় ও এক ড্রয়ে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে টিয়ার এ-তে উঠেছে, যেখানে মূল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হবে। অন্যদিকে চারটি জয় পেলেও একটি ম্যাচে হেরে ১২ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় হওয়া পর্তুগাল খেলছে টিয়ার বি-তে।

বাছাইপর্বের পর টিয়ার ই–তে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচটি ছিল শেষ বত্রিশে, যেখানে প্রতিপক্ষ ছিল সেশেলস। নির্ধারিত সময়ের খেলা ১–১ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪–২ গোলে জয়লাভ করে পরের রাউন্ডে ওঠে বাংলাদেশ। গতকাল শেষ ষোলোর লড়াইয়ে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষেও নির্ধারিত সময়ের খেলা ১–১ গোলে শেষ হয়। এবার টাইব্রেকারে ৪–৩ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের কিশোরেরা।

এখন দলের সামনে মূল লক্ষ্য সেমিফাইনাল।