নতুন শাড়ি ও গয়নায় সেজে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট দিতে এসেছেন ১৯ বছর বয়সী জবা রানী। মাত্র দুই মাস আগে বিয়ে হয়েছে তাঁর। জীবনের প্রথম এই ভোটাধিকার প্রয়োগের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি বিশেষ সাজসজ্জায় এসেছেন। জবা রানী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম ভোটের অনুভূতিটাই অন্য রকম। এই দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখতে একটু সেজে এসেছি।’
আজ সকাল ১০টার দিকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন গৃহবধূ জবা রানী। সেই সময়ে কেন্দ্রটিতে নারী ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়, যা কেন্দ্রের ফটক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে পুরুষ ভোটারদের লাইনে ভিড় ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
একই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন দক্ষিণ বঠিনা এলাকার বাসিন্দা ৭৬ বছর বয়সী পঞ্চমী রানী। তাঁর অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের সমর্থকরা ভোটারদের নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘হামরা কাক ভোট দিমো, আগতেই ঠিক করে ফেলাইছু। এইঠে চাপাচাপি ক্যানেতে?’
দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নারী ভোটারদের জন্য তিনটি বুথ বরাদ্দ করা হয়েছে। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা রাজীব কুমার রায় জানান, এই কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ১৮৭ জন, যার মধ্যে নারী ভোটার ১ হাজার ৫৫৪ জন।
কেন্দ্রের বুথের সামনে নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বঠিনা এলাকার তাহমিনা বেগম (৪৮)। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা তাহমিনা বলেন, ‘সকালে ঘুম থাকি উঠিয়া ভোট দিবা চলে আইছু। এইঠে আসিয়া দেখু, আমার আগতে ভেল্লা লোক চলে আইছে। দেড় ঘণ্টা ধরি দাঁড়ায় আছু, অ্যালাও ভোট দিবা পারুনাই।’
সকাল সোয়া ১০টার দিকে ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে দেখা যায়, পুরুষ ভোটারদের বুথগুলো ফাঁকা থাকলেও নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই কেন্দ্রটিতে মোট ভোটার ৩ হাজার ৮১৭ জনের মধ্যে নারী ভোটার ১ হাজার ৮৯২ জন।
সর্দারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ঝরি রানী (৪৯) বলেন, ‘বাড়ির বেটিলা সব ভোট দিবা সকাল সকাল চলে আইছে। ফিরি রান্না করিবা হবে। ভোটখান তাড়াতাড়ি করিলে হামারতানে ভালো হয়।’
বেলা ১২টা পর্যন্ত সরেজমিনে পরিদর্শন করা সদর উপজেলার আখোপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাংরাই পুকুর শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আকচা ইউনিয়ন পরিষদ, ঝলঝলিপুকুর উচ্চবিদ্যালয়, মধুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঢোলারহাট এসসি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রেও নারী ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
আব্দুর রশিদ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আনোয়ার সাদাত জানান, এই এলাকার নারী ভোটাররা সাধারণত দলবেঁধে খুব ভোরে কেন্দ্রে চলে আসেন এবং প্রায় সব নির্বাচনেই এমন চিত্র দেখা যায়। অন্যদিকে পুরুষ ভোটাররা তাঁদের দৈনন্দিন কাজ শেষ করে পরে ভোট দিতে আসেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, সকাল থেকে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ভোট উৎসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো এলাকা থেকে তেমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
তবে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের ২ নম্বর বুথে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি দেখা যায়। সেখানে পুলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনজন। তাঁদের মধ্যে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আনোয়ারা বেগম, ধানের শীষ প্রতীকের বিশু দত্ত এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের ডাব প্রতীকের মোকছেদ আলী।
ডাব প্রতীকের প্রার্থীর নাম জানতে চাওয়া হলে মোকছেদ আলী তা বলতে পারেননি। তিনি কোন প্রার্থীর এজেন্ট—এমন প্রশ্নের জবাবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের এক এজেন্ট বলে ওঠেন, ‘জামায়াতের অফিস থেকে পাঠাইছে।’
উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও-১ (সদর-রুহিয়া-ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে ডাব প্রতীকের প্রার্থী হুসেইন মোহাম্মদ ওমর ফারুক। এছাড়া এই আসনেই ধানের শীষ প্রতীকের মির্জা ফয়সল আমীন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দেলাওয়ার হোসেন, হাতপাখা প্রতীকের খাদেমুল ইসলাম এবং বটগাছ প্রতীকের আব্দুল আলীম নিজামী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০টি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিটি কেন্দ্রের সব বুথেই ডাব প্রতীকের পোলিং এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন। অথচ নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডাব প্রতীকের প্রার্থীর কোনো ব্যানার-ফেস্টুন দেখা যায়নি এবং মাইকিংয়েও তাঁর প্রচার শোনা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় সব বুথে তাঁর এজেন্টদের উপস্থিতি ভোটারদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ডাব প্রতীকের প্রার্থী পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করেছেন এবং তাঁরা মূলত ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িপাল্লার হয়ে কাজ করছেন।
ঝলঝলি পুকুর উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভোটার বলেন, ‘আজকে ভোট দিতে এসে দেখলাম ডাব মার্কার পোলিং এজেন্ট। আমি হতবাক হয়েছি। এত লোক কোথা থেকে?’
পাঁচটি ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ডাব প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের তালিকা সংগ্রহ করে দেখা যায়, প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টের নাম ও স্বাক্ষরের ঘরে জাকির হোসেন নামের এক ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছেন।
মুক্তকণ্ঠের পক্ষ থেকে ডাব প্রতীকের ১৮ জন পোলিং এজেন্টের সঙ্গে কথা বলা হলে দেখা যায়, আটজন প্রার্থীর নাম বলতে পারেননি এবং ছয়জন ভুল নাম বলেছেন। বাকি চারজন প্রার্থীর নাম সঠিকভাবে বলতে পারলেও তাঁরা কীভাবে বা কার মাধ্যমে এজেন্ট হয়েছেন, তার উত্তর দিতে পারেননি। তবে তাঁদের কয়েকজন জানিয়েছেন, জাকির হোসেনের মাধ্যমে তাঁরা এই দায়িত্ব পেয়েছেন।
ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ডাব প্রতীকের পুলিং এজেন্ট সাথী আক্তারকে তিনি দাঁড়িপাল্লার এজেন্ট কি না, তা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘হামার চালাকি খান বুঝে গেইছেন?’
এই বিষয়ে জামায়াতের প্রার্থীকে অভিযুক্ত করেছেন ধানের শীষের প্রার্থী। তিনি বলেন, ‘জামায়াত ঘটনাটি গোটা নির্বাচনী এলাকাতেই ঘটিয়েছে। ডাব প্রতীকের প্রার্থী তাদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে এই কাজ করেছেন। তিনি (হুসেইন মোহাম্মদ ওমর ফারুক) আমাদেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা তাঁর প্রস্তাবে রাজি হইনি। আমরা রাজি না হলে কী হবে, জামায়াত ঠিকই তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।’
অভিযোগের বিষয়ে ডাব প্রতীকের প্রার্থী হুসেইন মোহাম্মদ ওমর ফারুক মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা থেকে আমার দলের লোকজন এসে যাবতীয় নির্বাচনী প্রচারণার কাজ করেছেন।’
নিজ দলের পোলিং এজেন্টদের ধানের শীষের পক্ষে কাজ করানোর জন্য বিএনপির প্রার্থীর কাছে আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছিলেন কি না, জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কথা তাঁরা ছড়াচ্ছে। আমি একটি ভোটকেন্দ্রে ঢুকতেছি। ব্যস্ত আছি।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।