এক সময়ের জনপদ, যেখানে মানুষের বসতঘর, উঠান আর সারি সারি নারকেল-সুপারির গাছ ছিল, সেখানে এখন কেবল বইছে মধুমতী নদীর পানি। নদীর বুক থেকে জেগে থাকা কয়েকটি গাছের আগা যেন এক সময়ের হারিয়ে যাওয়া জনপদের শেষ চিহ্ন হিসেবে টিকে আছে। চোখের সামনে ভিটেমাটি হারিয়ে কেউ আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের বাড়িতে, আবার কেউবা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের আমডাঙ্গা গ্রামে মধুমতী নদীর ভয়াবহ ভাঙনে এমন এক মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
চলতি মৌসুমে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি, কয়েকশ একর ফসলি জমি এবং একটি মসজিদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের ফলে নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে অন্তত ৩০০ পরিবার। শুধু বসতবাড়ি নয়, ঝুঁকিতে রয়েছে আমডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গ্রামের প্রধান পাকা সড়কটিও।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে তারা নদী ভাঙনের শিকার হয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে অস্থায়ীভাবে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে যে পরিমাণ ভাঙন হয়েছে, তার তুলনায় এই উদ্যোগ একেবারেই যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ তাদের। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, আর্থিক ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতি ঠেকাতে দ্রুত স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা জরুরি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সরেজমিনে আমডাঙ্গা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মধুমতী নদীর উত্তর পাড়জুড়ে ভাঙনের গভীর ক্ষত। নদীর পাড় থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ গজ ভেতরে নদীর পানিতে নারকেল, সুপারি ও কলাগাছের আগা দেখা যাচ্ছে। তীব্র স্রোতে দুলছে গাছের ডালপালা। একসময় যেসব জায়গায় বাড়িঘর, উঠান ও গাছপালা ছিল, সেখানে এখন শুধু নদীর পানি।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আমডাঙ্গা গ্রামের মানুষের কাছে নদীভাঙন দীর্ঘদিনের এক দুঃসহ দুর্ভোগ। গত এক দশকে ধারাবাহিক ভাঙনে শত শত একর ফসলি জমি, অসংখ্য বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে চলে গেছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনও তীব্র হয়। এর ফলে অনেক পরিবার একাধিকবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমেও প্রায় দুই মাস ধরে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন শুরু হলে বালুভর্তি বস্তা ফেলে সাময়িক প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় পরবর্তী মৌসুমে আবারও একই সংকটে পড়তে হয় তাদের।
আমডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা বাপ্পি শেখ বলেন, “প্রতি বছরই আমাদের নদীভাঙনের কবলে পড়তে হয়। গত মৌসুমে গ্রামের অন্তত ৮০টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। চলতি মৌসুমেও দুই মাসের বেশি সময় ধরে ভাঙন চলছে।”
একই গ্রামের অহিদ মুন্সি বলেন, “এ বছর নদী আমার ভিটেমাটি গিলে খেয়েছে। তিন বছরে আমার বাড়ি দুবার ভেঙেছে। এ বছর আমার মতো এলাকার অন্তত ১০০ পরিবারের বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে গেলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কোনো ব্যবস্থা হয়নি।”
ইনসান মোল্লা নামের আরেক বাসিন্দা জানান, এ বছর নদীভাঙনে তার ফসলি জমির পাশাপাশি ঘরবাড়িও বিলীন হয়েছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখন তাকে চরম কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।
নদীভাঙনের আঘাত শুধু বসতবাড়ি ও কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাদ পড়েনি ধর্মীয় স্থাপনাও। গত সপ্তাহে এলাকার একটি বড় একতলা মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মুনছুর মোল্লা বলেন, “গত সপ্তাহে এলাকার বড় একতলা মসজিদটি চোখের সামনে নদীতে চলে গেল। আমরা কিছুই করতে পারলাম না। এখন এলাকার মানুষের নামাজ পড়ার মতো ভালো কোনো মসজিদ নেই।”
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আমডাঙ্গা গ্রামের হাবিবুর মোল্লা, মুরাদ মোল্লা, সামচুন্নাহার বেগম, রেখা খানম, ইলু ভেন্ডার ও শহিদুল মোল্লাসহ অন্তত ১০০ পরিবারের বসতভিটা, গাছপালা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
জয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম সুমন বলেন, “ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। এর মধ্যে আমডাঙ্গা গ্রামের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। প্রতিবছর গ্রামটি ভাঙনের শিকার হলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।” তিনি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ সাহা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির স্রোতের কারণে ওই এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়েছে।” নদীভাঙনের জন্য অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকেও অনেকাংশে দায়ী করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “ভাঙন রোধে আপৎকালীন অস্থায়ী কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমডাঙ্গা এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে ১ হাজার ৭০০ মিটার স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্প প্রণয়ন করে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে এলাকায় স্থায়ী তীররক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”