নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় মধুমতী নদীর বিধ্বংসী ভাঙনের মুখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদীতীরের শত শত মানুষ। চোখের সামনেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে সারাজীবনের সঞ্চয়ে গড়ে তোলা বসতবাড়ি এবং মূল্যবান ফসলি জমি। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে লোহাগড়া ও কোটাকোল ইউনিয়নের প্রায় ১৫০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে আরও সাড়ে ৫০০ পরিবার বর্তমানে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ তাদের ভিটেমাটিও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নদীর এই গ্রাসে কেবল বসতবাড়িই নয়, ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫০ একর কৃষি জমি, দুই কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রামীণ সড়ক এবং একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকায় তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, এক সময় নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই গ্রামগুলোতে প্রায় নয় শতাধিক পরিবারের বসবাস ছিল। তাদের মধ্যে অনেকেই ইতিপূর্বে কয়েক দফা ভাঙনের শিকার হয়েছেন এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ তাদের পৈতৃক ভিটা হারিয়েছেন, আবার অনেকের স্বজনদের কবরও নদীর পেটে চলে গেছে। সর্বস্ব হারিয়ে অনেক পরিবার এখন অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, মধুমতী নদী থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এর ফলেই ভাঙনের প্রবণতা বহুগুণ বেড়েছে। তারা দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করার এবং নদীভাঙন রোধে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার বিকেলে লোহাগড়া ইউনিয়নের ছাগলছিড়া ও কোটাকোল ইউনিয়নের রায়পাশা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পাড়জুড়ে ভাঙনের চিহ্ন। কোথাও ঘরের উঠান, আবার কোথাও বসতভিটার একাংশ নদীতে মিশে গেছে। ভাঙনের আতঙ্কে অনেক মানুষ তাদের ঘরের আসবাবপত্র ও মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
রায়পাশা এলাকার ইসলাম ফকির বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে সংসার গুছিয়েছিলাম। নদীভাঙনে সেই ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারানোর উপক্রম হয়েছে। একদিকে সম্পদ হারাচ্ছি, অন্যদিকে নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য নেই। আমরা চাই, সরকার দ্রুত নদীর পাড় রক্ষার ব্যবস্থা করুক।’
অন্যদিকে আলিম মোল্যা বলেন, ‘প্রতিদিনই নদীর পাড় নতুন করে ভাঙছে। আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, কাল সেটিও নদীতে চলে যেতে পারে। আমাদের এলাকার মানুষের মধ্যে সবসময় আতঙ্ক কাজ করছে। স্থায়ীভাবে নদীভাঙন ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
ছাগলছিড়া গ্রামের বাসিন্দা মিন্টু মোল্যার ঘরও নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দিনের বেলায় কিছুটা বুঝতে পারি, কিন্তু রাতের ভাঙন সবচেয়ে ভয়ংকর। হঠাৎ করে পাড় ধসে পড়ে। তখন কোথায় যাব, কী করব—কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। আমরা গরিব মানুষ। অন্য জায়গায় জমি কিনে বা ঘর তুলে থাকার মতো সামর্থ্য নেই। অথচ নদীভাঙন রোধে আমাদের খোঁজ নেওয়ার মতোও কেউ নেই।’
একই কথা বলেন রায়পাশা গ্রামের রহিমা বেগম। তিনি জানান, ‘কয়েক বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। এর আগেও দুইবার বাড়ি ভেঙেছে। অনেক কষ্ট করে নতুন করে বাড়ি করেছি। এখন সেই বাড়িটিও ভাঙনের মুখে। নদী এভাবে ভাঙতে থাকলে আমাদের আর থাকার জায়গা থাকবে না।’
নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ইজারাকৃত বালুমহালের নির্ধারিত এলাকার বাইরে কোনো ইজারাদার বালু উত্তোলন করলে তার ইজারা বাতিল করা হবে। তিনি আরও জানান, অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নিয়ম না মেনে বালু উত্তোলনের ফলে নদীপাড়ের মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। তবে নির্ধারিত প্রকল্পের বাইরে পাউবোর কাজ করার সুযোগ নেই। নিয়মবহির্ভূত বালু উত্তোলনের কারণেই ভাঙন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে বলে জানান তিনি।
নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমান বাচ্চু মুক্তকণ্ঠকে জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মধুমতী নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমেই এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।