১৯৩৫ সালে হাসান আলী ঢালী এবং তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর হাত ধরে বুড়িগঙ্গার তীরে সামান্য কিছু দেশি ফলের কেনাবেচার মাধ্যমে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ এক বিশাল রূপ নিয়েছে। বর্তমানে এই বাজারটি বাদামতলী থেকে শুরু করে ওয়াইজঘাট, শাহজাদা মিয়া লেন এবং বুড়িগঙ্গা ভবন মার্কেট পর্যন্ত বিস্তৃত। সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘বাদামতলী ফলের আড়ত’ নামেই পরিচিত।
পুরো ঢাকা শহর যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখন বুড়িগঙ্গার এই তীরটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত প্রাণবন্ত। নৌকার বইঠার শব্দ, ট্রলারের ইঞ্জিনের ভটভট আর কুলি-মজুরদের উচ্চস্বরে হাঁকডাক—সব মিলিয়ে এখানে গড়ে ওঠে এক কর্মচঞ্চল জগৎ। এই ব্যস্ততার মাঝেই বাতাসে ভেসে বেড়ায় আপেল, আম, কাঁঠাল কিংবা কমলার মিষ্টি সুবাস। ঢাকার সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন ফলের আড়ত ‘বাদামতলী ফলের আড়ত’-এর ভোরের চিত্রটি ঠিক এমনই।
সদরঘাট এবং বাবুবাজারের মাঝামাঝি এলাকায় এই বাজারের অবস্থান। প্রচলিত আছে যে, একসময় এই ঘাটে একটি বিশাল বাদামগাছ ছিল, আর সেখান থেকেই এর নামকরণ করা হয়েছে ‘বাদামতলী’। প্রায় ২৫০টি বড় আড়ত নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাজারে প্রতিদিন ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খুচরা বিক্রেতাদের ভিড় জমে।
বাদামতলী বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ট্রাক থেকে সরাসরি ফল বিক্রির ‘অকশন’ বা নিলাম প্রক্রিয়া। বিভিন্ন জেলা থেকে রাতে ছেড়ে আসা ফলের ট্রাকগুলো ঘাটে পৌঁছানোর সাথে সাথেই ব্যাপারী ও পাইকারেরা সেগুলোকে ঘিরে ধরেন। ভোরবেলায় আড়তদাররা ফল কিনে নেওয়ার পর যে ফলগুলো বাকি থাকে, সেগুলো ট্রাকের ওপর থেকেই নিলামে বিক্রির জন্য বিভিন্ন দাম হাঁকানো হয়। প্রায় একই সময়ে ৩০টির বেশি ট্রাকে এই নিলাম প্রক্রিয়া চলে।
ট্রাকের সামনে তখন অসংখ্য ক্রেতার ভিড়। কেউ আপেলের কার্টন মেলে ধরছেন, কেউ মাল্টা, আবার কেউবা কমলা বা আঙুরের বক্স পরীক্ষা করছেন। বিক্রেতা যখন দাম হাঁকেন, তখন ক্রেতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ দাম দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি হাত তুলে তা জানান। বিক্রেতার কাছে ক্রেতার প্রস্তাবিত দাম পছন্দ হলে, গাড়ি থেকেই সদ্য কেনা আপেল, কমলা, মাল্টা কিংবা আঙুরের কার্টন ক্রেতার হাতে ছুড়ে দেওয়া হয়। এরপর তৎক্ষণাৎ টাকা পরিশোধ করে ফল সংগ্রহ করে নেন ক্রেতারা।
ফল বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। দরদামের এই ব্যস্ততা ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ভ্যানে খুচরা ফল বিক্রি করেন আবদুর রহমান। তিনি এই ফল কিনতেই জুরাইন থেকে এসেছেন। তিনি জানান, এরই মধ্যে ৩ হাজার ৯০০ টাকায় আপেল ও ২ হাজার টাকায় কিনলেন মাল্টা। জুতসই দামে আরও কিছু কিনে নিজের গন্তব্যের দিকে ফিরতে চান।
মৌসুমভেদে বাদামতলীতে দেশি ফলের রূপ পরিবর্তিত হয়। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত এখানে আম, লিচু, লটকন, কাঁঠাল ও আনারসের উৎসব চলে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আমের মৌসুম অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলেও, এখানে পাওয়া যায় বারোমাসি কাটিমন এবং আশ্বিনা আম।
প্রায় ২৫ বছর ধরে বাদামতলীতে ব্যবসা করছেন মুন্সিগঞ্জের রাসেল লাকুড়িয়া। তিনি জানান, আমের গুণগত মান এবং ব্যাগিং করা ও না-করার ওপর ভিত্তি করে দরদাম ওঠানামা করে। আমে ব্যাগিং করার সুবিধা হলো রোগ পোকার আক্রমণ কম হয় এবং আম থাকে একদম সতেজ। কোনো ঝড়ঝাপটার আঁচড় লাগে না। কালো ছোপ ছোপ দাগ পড়ে না।
ব্যাগিং করা ফ্রেশ আমকে বিক্রেতারা বলেন ‘টিস্যু করা আম’। আর যেসব আম ব্যাগিং করা হয় না এবং গায়ে কালো ছোপ ছোপ দাগ থাকে, সেগুলোকে বিক্রেতারা বলেন ‘নিয়ম আম’। স্বভাবতই টিস্যু আমের চেয়ে নিয়ম আমের দাম তুলনামূলক কম হয়ে থাকে।
উদাহরণস্বরূপ, ব্যাগিং করা ও ভালো মানের গাছপাকা কাটিমন আমের দাম প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। অন্যদিকে ব্যাগিং ছাড়া নিয়ম মানের কাটিমনের দাম প্রায় ১৮০ টাকা। বিপরীতে আশ্বিনা আমের দাম প্রতি কেজি ১৮০ টাকা থেকে ২২০ টাকা।
যেহেতু এটি একটি পাইকারি বাজার, তাই এখানে খুচরা বিক্রির সুযোগ নেই। আম এখানে ক্রেট হিসেবে বিক্রি হয়। ক্রেটসহ মোট ওজন ২৮ কেজি হলে, ক্রেট ও ভেতরে থাকা কাগজের ওজন বাবদ ২ কেজি বাদ দিয়ে ২৬ কেজি আমের দাম ধরা হয়।
দেশি ড্রাগন ফল ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। সবুজ রঙের বারি মাল্টা–১ বা পয়সা মাল্টা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে।
দেশি ফলের পাশাপাশি বাজারের বড় একটি অংশ দখল করে আছে আমদানি করা বিদেশি ফল। দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড ও চীন থেকে আসা আপেল, মাল্টা, কমলা ও আঙুরের চাহিদা সারা বছরই থাকে। আপেলের মধ্যে পাওয়া যায় হালকা গোলাপি রঙের ফুজি আপেল, লালচে খয়েরি রঙের দক্ষিণ আফ্রিকান আপেল ও গালা আপেল।
১৮-১৯ কেজি ওজনের এক কার্টন আপেলের দাম পড়ে ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা। ১৮-১৯ কেজি ওজনের এক কার্টন বড় আকারের কমলার দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। ১০ কেজি ওজনের কার্টন বক্সের ছোট জাতের চায়না কমলার দাম ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। আমদানি করা হলুদ মাল্টার প্রতি ১৫ কেজি ওজনের কার্টনের দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকা।
প্রতি ৭ কেজি ওজনের লাল আঙুরের দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭৫০ টাকা এবং সাদাটে সবুজ আঙুরের দাম ২ হাজার টাকা। ছোট আকারের আনারের দাম প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা এবং বাতাবিলেবুর সমান বড় আকৃতির আনারের দাম প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা। হলুদ রঙের তাজা কাঁচা খেজুরের দাম প্রতি ১০ কেজি ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।
বাবুবাজার ব্রিজের ঠিক কাছেই বায়তুল আমান জামে মসজিদের বিপরীতে পাওয়া যাবে থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা ফলের সংগ্রহ। সেখানে দাড়িওয়ালা লিচু রাম্বুটান প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, ডুরিয়ান ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, অ্যাভোকাডো ১ হাজার ৪০০ টাকা, সোনালি রঙের কিউই ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, সবুজ রঙের কিউই ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, প্লাম ১ হাজার টাকা, ব্লু বেরি ৩ হাজার ২০০ টাকা ও চেরি ফল মিলবে চার হাজার টাকা কেজি দরে।
শাহজাদা মিয়া লেন ধরে এগোলে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি খেজুরের সংগ্রহশালা। এখানে প্যাকেটবন্দী পাকা খেজুর পাওয়া যায়, যা সৌদি আরব, ইরান ও আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়েছে। মানভেদে আজওয়া খেজুরের দাম প্রতি ৫ কেজি ওজনের কার্টন ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, মেডজুল খেজুর ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং মাবরুম খেজুর প্রতি কার্টন ৫ হাজার টাকা। বর্তমানে ক্রেতা কম থাকলেও রমজান মাসকে কেন্দ্র করে খেজুরের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্তান হয়ে সদরঘাট বা বাবুবাজার ব্রিজে ওঠার আগেই নামা সবচেয়ে সুবিধাজনক। সেখান থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটাপথে বাদামতলীর ঘাট। ঢাকার নবাববাড়িখ্যাত আহসান মঞ্জিল থেকে শুরু করে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত এই ফলের আড়ত বিস্তৃত।
ভোর ৫টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে ট্রাকের নিলাম, হাঁকডাক ও বাজারের আসল ব্যস্ততা দেখা যায়। তবে ফলের আড়তগুলোতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার অন্যান্য বাজারের সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার হলেও বাদামতলী ফলের বাজারের ছুটির দিন হলো শনিবার। মূলত শুক্রবার বর্ডার (সীমান্ত) বন্ধ থাকে বলে শনিবার কোনো পণ্যবাহী ট্রাক এখানে আসে না। ফলে শনিবার দিনটি সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় বেশ সুনসান থাকে।
অকশনে ফল কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ এখানে আগে থেকে ফলের মান যাচাই করার সুযোগ থাকে না। তাই অকশনে দাম কিছুটা কম হলেও কার্টনভর্তি ফলের মধ্যে থেঁতলে যাওয়া বা পচা ফল থাকতে পারে।
কাঁচামাল হিসেবে ফলের দাম পরিবর্তনশীল, তাই সময়-সময় দাম ওঠানামা করে। ফল কেনার আগে তা যাচাই করে নেওয়া উচিত। বিভিন্ন আড়তে থাকা ফলের দোকানে প্রতিটি ফল দেখে ও যাচাই-বাছাই করে কেনার সুযোগ পাওয়া যায়। শনিবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে সকালের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা শ্রেয়। বাসে গেলেও ফল কিনে ফেরার সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশা হতে পারে সবচেয়ে সুবিধাজনক বাহন।