শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দ মানেই নতুন পোশাকের বাহার, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো আর প্রিয়জনদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা। আর এই উৎসবের আমেজে খাবারের ভূমিকা থাকে অপরিসীম। বিশেষ করে এই সময়ে অনেকেই নিরামিষ খাবারের স্বাদ নিতে পছন্দ করেন। যারা বাড়িতে রান্নার পাশাপাশি বাইরে থেকে নিরামিষ খাবারের স্বাদ নিতে চান, তাদের জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বিশেষ কিছু দোকান হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। কোথাও মিলবে খাঁটি বাঙালি নিরামিষ পদের বৈচিত্র্য, কোথাও বিরিয়ানি ও পোলাওয়ের রাজকীয় আয়োজন, আবার কোথাও দেশীয় পিঠাপুলি ও নাড়ুর মাধ্যমে উৎসবের আমেজ। পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, পান্থপথ ও বনানীর আটটি বিশেষ খাবারের দোকানের বিস্তারিত খোঁজ রইল এখানে।

জগন্নাথ ভোজনালয়
পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার শিবমন্দিরের নিকটবর্তী ১১০ নম্বর বাড়ির দোতলায় অবস্থিত জগন্নাথ ভোজনালয়। ২০০৫ সালে শ্যামল অধিকারী ও নিতাই পালের যৌথ উদ্যোগে এই ভোজনালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ২০২০ সালে নিতাই পালের মৃত্যুর পর বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন অশোক কবিরাজ।

এখানে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ ধরনের নিরামিষ পদ রান্না করা হয়। ছোট ছোট স্টিলের বাটিতে খাবার পরিবেশন করা হয়, যেখানে থাকে শুক্তো, ফুলকপির রসা, ছানার ধোকা, লাবড়া, মোচার ঘন্ট, সয়াবিনের রসা এবং বিভিন্ন ধরনের শাক ও ভর্তা। ক্রেতারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী পদ বেছে নিতে পারেন। খাবারের শেষ পাতে থাকে পায়েস, মিষ্টি দই কিংবা চাটনি। নিরামিষ খাবারের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে এখানকার রান্নায় পেঁয়াজ ও রসুন ব্যবহার করা হয় না। একাদশীর দিন এখানে বিশেষ আয়োজন থাকে—পুষ্পান্ন, শ্যামা চালের পায়েস, সাবুদানার ভুনা ও সয়াবিনের রসা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই ভোজনালয়টি। তবে ভিড় বেশি হলে কখনো কখনো রাত ১১টা পর্যন্তও খাবার পরিবেশন করা হয়।

অনুরাধা মহাপ্রসাদ ভোজনালয়
তাঁতীবাজার গলির ৯ নম্বর হোল্ডিংয়ে অবস্থিত অনুরাধা মহাপ্রসাদ ভোজনালয়ের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর মহাপ্রসাদি রান্না ও সাত্ত্বিক পরিবেশনা। এখানকার সব খাবার তৈরি করা হয় দেশি ঘি ও সূর্যমুখী তেলে। এই ভোজনালয়ের অন্যতম জনপ্রিয় পদ হলো ভেজ পোলাও। পোলাওয়ের চালের সঙ্গে সয়া, গাজর ও আলু দিয়ে তৈরি এই খাবারের দাম মাত্র ৮০ টাকা।

এছাড়া এখানে পাওয়া যায় ছানার রসা, ডালপুরি, ছোলার ডাল, বিভিন্ন ধরনের সবজি ভাজি ও পায়েস। সকালের নাশতার জন্য পরোটা ও সবজির ব্যবস্থাও রয়েছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে অনুরাধা মহাপ্রসাদ ভোজনালয়।

গোবিন্দাস সাত্ত্বিক ফুডস
মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে অবস্থিত গোবিন্দাস সাত্ত্বিক ফুডস নিরামিষপ্রিয় ভোজনরসিকদের কাছে একটি অত্যন্ত পরিচিত নাম। নামের সার্থকতা বজায় রেখে এখানে পরিবেশন করা হয় সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক ও নিরামিষ খাবার। দুর্গাপূজা উপলক্ষে আলাদা কোনো মেনু না করে তারা নিয়মিত খাবারের স্বাদ ও মান ধরে রাখার চেষ্টা করে।

Pূজার দিনগুলোতে এখানকার জনপ্রিয় পদের তালিকায় থাকে সুবাসিত পুষ্পান্ন, পনির বিরিয়ানি ও গরম লুচি। এসবের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় বিভিন্ন ধরনের তরকারি। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এখানে খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে ঘরে বসেই খাবার পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা রয়েছে।

জেপিএস ভেজ কিচেন
মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ে অবস্থিত জেপিএস ভেজ কিচেনের মেনুতে ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক নিরামিষ পদের এক চমৎকার সমাহার দেখা যায়। এখানে দুপুর ও রাতের খাবারের পাশাপাশি বিকেলের নাশতারও সুব্যবস্থা আছে।

Pূজা উপলক্ষে এখানকার বিশেষ আকর্ষণ হলো কাশ্মীরি পনির দম বিরিয়ানি ও ফ্রায়েড রাইস। এছাড়া পাওয়া যায় পনির মসলা, কাশ্মীরি দম কালিয়া, সয়া মুগডালের ভুনা, সয়া বাঁধাকপি ভাজি, মিক্সড সবজি, ফুলকপির সাম্বার ও সয়াবিন কারি। খাবারের স্বাদ বাড়াতে সাথে থাকে টক-মিষ্টি জলপাইয়ের চাটনি। মিষ্টিমুখের জন্য রয়েছে চুষির পায়েস, ঘন দই ও রাবড়ি মালাই।

বিকেলের নাশতায় এখানে সমুচা, নিরামিষ শর্মা কিংবা লুচি-ছোলার ডাল খাওয়া যায়। সকাল সাড়ে আটটা থেকে রাত ১০টা ২০ মিনিট পর্যন্ত এই দোকানটি খোলা থাকে। তিন বেলার খাবারের পাশাপাশি এখানে পঞ্চব্যঞ্জনের থালি, বেকারি পণ্য ও জন্মদিনের কেকও পাওয়া যায়। অনলাইনে খাবার অর্ডার করার সুবিধাও এখানে বিদ্যমান।

নীলাচল
পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতাল থেকে কিছুটা সামনেই অবস্থিত নীলাচল ভেজ রেস্তোরাঁ। চলতি বছরের মার্চ মাসে যাত্রা শুরু করা এই রেস্তোরাঁটি সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

রেস্তোরাঁটির মালিক সুভাষ সাহার মেরুল বাড্ডায় গোপালস নামে আরও একটি নিরামিষ খাবারের রেস্তোরাঁ রয়েছে। নীলাচলে সরাসরি গিয়ে খাওয়ার পাশাপাশি অনলাইনেও অর্ডার দেওয়া যায়। এখানকার উল্লেখযোগ্য পদের মধ্যে রয়েছে পাঁচ সবজি, মুগডাল, কাশ্মীরি ধোকা এবং শর্ষে দিয়ে পনির ও পটোল। এছাড়া পনির ফ্রায়েড রাইস, ধোকা বিরিয়ানি ও মালয়েশিয়ান সয়াবিনের পদ বেশ জনপ্রিয়। মিষ্টিমুখের জন্য আছে রসগোল্লা ও চুষির পিঠা। সন্ধ্যার নাশতায় পাওয়া যায় পাস্তা, রোল, লুচি ও আলুর দম। নীলাচলের সব পদই শর্ষের তেলে রান্না করা হয়, তবে একাদশীর বিশেষ খাবারের ক্ষেত্রে সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়।

বৃন্দাস
গ্রিন রোডে গ্রিন লাইফ হাসপাতালের পাশেই অবস্থিত বৃন্দাস। প্রায় তিন বছর ধরে নিরামিষ খাবারের সেবা দিয়ে আসছে এই প্রতিষ্ঠানটি। একই এলাকায় সম্প্রতি তাদের আরেকটি শাখা খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃন্দাসের প্রতিদিনের খাবারের তালিকা তাদের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। সরাসরি রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাওয়ার পাশাপাশি অনলাইনে অর্ডার করার সুবিধাও আছে এবং নিজস্ব সরবরাহকর্মীদের মাধ্যমে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়।

এখানকার জনপ্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে কাশ্মীরি রোস্ট, সয়া চাপ রোস্ট ও সয়া পনির বিরিয়ানি। যারা নিরামিষ খাবারের তালিকায় বিরিয়ানি কিংবা রোস্টের মতো পদ খুঁজছেন, তাদের জন্য বৃন্দাস হতে পারে একটি চমৎকার বিকল্প।

যাত্রাবিরতি
বনানীতে নিরামিষ খাবারের স্বাদ নিতে পারেন যাত্রাবিরতিতে। সকাল ১০টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই রেস্তোরাঁটি। খোলামেলা পরিবেশের এই রেস্তোরাঁর ছাদে বসে খাবার উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে।

এখানকার বিশেষ পদের মধ্যে রয়েছে খিচুড়ি প্ল্যাটার, মাশরুম তেহারি ও ভেজিটেবল কোফতা। পরিচিত বাঙালি খাবারের পাশাপাশি ভিন্ন স্বাদের নিরামিষ পদ চেখে দেখতে চাইলে যাত্রাবিরতি হতে পারে পছন্দের ঠিকানা।

সঞ্চয়িতা
গুলশান–১-এ অবস্থিত সঞ্চয়িতা অন্য রেস্তোরাঁগুলোর চেয়ে কিছুটা আলাদা। এখানে নিরামিষ খাবারের পাশাপাশি দেশীয় খাবারের ঐতিহ্য, পরিবেশবান্ধব উপকরণ এবং ব্যক্তিগত আতিথেয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। রেস্তোরাঁটির কোনো প্রকাশ্য দোকান নেই; গুলশান–১-এ তাদের নিজস্ব একটি রসুইঘর রয়েছে। বুকিং নিশ্চিত হওয়ার পর অতিথিদের ঠিকানা জানানো হয়।

সঞ্চয়িতার আয়োজনে দেশীয় পিঠাপুলি ও নাড়ুর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নারকেল নাড়ু, বাদাম নাড়ু, মুগের নাড়ু, নারকেল পুলি, বাদাম টানা, গোলাপ পিঠা ও নকশি পিঠার মতো খাবার এখানে নিয়মিত তৈরি করা হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে এসব খাবার উপহার হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থাও আছে।

পিঠাপুলি ও নাড়ু পরিবেশন করা হয় মাটির পাত্র ও শানকিতে। উপহারের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বদলে মাটির পাত্র ও সিরাজগঞ্জের গামছার মতো দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়। খাবার তৈরিতে চিড়া, চাল, আখের গুড়, খেজুরের গুড় ও চালের গুঁড়ার মতো খাঁটি উপকরণ ব্যবহৃত হয়।

Pূজা উপলক্ষে সঞ্চয়িতা ‘নৈবেদ্যের থালা’ নামে একটি বিশেষ খাবারের আয়োজন করেছে। এতে থাকে শিউলি ফুলের চা, ডাল বড়া, ফুলকপির রোস্ট, গোবিন্দভোগ চালের সবজি পোলাও, ধোকার ডালনা, মিষ্টি আলুর নিমকি এবং পান-সুপারি।

তবে এখানে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা সীমিত। একসঙ্গে চার থেকে আটজনের জন্য আয়োজন করা হয় এবং অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে বুকিং দিতে হয়। অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করে সঞ্চয়িতা। উৎসবের খাবার উপহার হিসেবে পাঠাতে বা অন্য কোনো আয়োজনের জন্য তাদের ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করা যায়।