পাহাড়ি ঐতিহ্যের গয়না নিয়ে ব্যবসা করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল দীপ্তি চাকমার। তবে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা ছিল পুঁজির অভাব। প্রতিকূলতাকে জয় করে বর্তমানে তিনি রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে দুটি নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক। তাঁর এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম ‘অর্নামেন্টস অব ধনপুদি’।
দীপ্তি চাকমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাঙামাটির কুতুকছড়ি এলাকায়। তিনি সতীশ চন্দ্র চাকমা ও শিখা চাকমা দম্পতির বড় মেয়ে। ব্যবসার শুরুতে তাঁর হাতে কোনো অর্থ ছিল না, তাই তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে একটি পেজ খুলে উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা শুরু করেন। তিনি স্থানীয় বাজারে গিয়ে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন গয়না পছন্দ করতেন এবং সেগুলোর ছবি তুলে নিজের ফেসবুক পেজে আপলোড করতেন। ক্রেতারা যখন কোনো গয়না পছন্দ করতেন, তখন তাঁদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে দোকানির কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে ক্রেতার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতেন।
এভাবেই ক্রেতাদের আগাম টাকার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসার ভিত্তি গড়ে তোলেন দীপ্তি। সময়ের সাথে সাথে তাঁর ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে অনলাইন ব্যবসার পাশাপাশি তাঁর দুটি স্থায়ী শোরুম রয়েছে। একটি রাঙামাটি শহরে এবং অন্যটি খাগড়াছড়ি শহরের জামতলা এলাকায়। সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে তিনি প্রতি মাসে গড়ে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা আয় করছেন।
সম্প্রতি খাগড়াছড়ির জামতলা বিক্রয়কেন্দ্রে দীপ্তি চাকমার সঙ্গে কথা হয়। ২০১৭ সালে যখন তিনি স্নাতকের (সম্মান) ছাত্রী, তখনই এই ব্যবসার হাতেখড়ি হয় তাঁর। সেই শুরুর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘শুরুতে আমার হাতে কোনো পুঁজি ছিল না। তাই নিজের টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা করা সম্ভব ছিল না। ক্রেতারা পেজ থেকে কিছু কিনতে চাইলে তাঁদের আগেই ৫০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করতে হতো। এই টাকাই ছিল মূলত আমার পুঁজি।’
আগাম টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দীপ্তি জানান, একটি বিশেষ সুযোগ তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা শুরুর কিছুদিন পরই এক বান্ধবীর বিয়ের সব অলংকার সরবরাহের অর্ডার পেয়েছিলাম। এটি ছিল আমার জন্য বড় একটি সুযোগ। কনের অলংকার দেখে তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা বেশ পছন্দ করেন। তাঁদের অনেকেই এসব অলংকার কোথা থেকে কিনেছেন, সেটি জানতে চেয়েছেন। এর সূত্র ধরে অনেক নতুন ক্রেতা বাড়তে শুরু করে। আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়।’
অনলাইন ব্যবসার প্রসারের পর পুঁজি সঞ্চয় করতে সক্ষম হন তিনি। সেই সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ২০২২ সালে রাঙামাটি শহরে প্রথম বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ২০২৪ সালে খাগড়াছড়িতে দ্বিতীয় শোরুমটি চালু করেন।
দীপ্তি চাকমা তাঁর প্রতিষ্ঠানে পাহাড়ি নারীদের ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী ‘আলজরা’, ‘আজুলি’, ‘হুজি হারু’, ‘থেং হারু’, বাজু, কয়েন মালা, নেকলেস, টিকলি, আংটি ও চুড়িসহ নানা ধরনের অলংকার বিক্রি করেন। এই গয়নাগুলো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিয়ে এবং বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী গয়না-অলংকারের আলাদা সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমি চাই, এসব অলংকার আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাক। অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি শোরুমে এসে ক্রেতারা সরাসরি অলংকার দেখতে পারছেন।’
ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মাঝেও পড়াশোনার প্রতি ছিলেন তিনি যত্নবান। ২০১৩ সালে রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ২০১৫ সালে রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর ২০২০ সালে আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ২০২২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যবসার কারণে পড়ালেখা শেষ করে আর চাকরির পেছনে ছুটতে হয়নি। নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়েই থাকি। দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং দোকান ভাড়া বাদ দিয়েও মাসে প্রায় ৫০ হাজার মতো লাভ হয়। ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলছি।’
বর্তমানে খাগড়াছড়ির শোরুমে দুজন কর্মী কাজ করছেন, যাদের একজন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এছাড়া ব্যবসা পরিচালনায় দীপ্তিকে সার্বিক সহযোগিতা করছেন তাঁর স্বামী প্রমোতোষ চাকমা।
পাহাড়ি নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহের কথা উল্লেখ করে দীপ্তি বলেন, ‘অনেক নারী নিজের উদ্যোগে কিছু করতে চান। প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারেন না। তাঁদের জন্য যদি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে নারী উদ্যোক্তা আরও বাড়ত।’
দীপ্তির এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন খাগড়াছড়ি জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সুস্মিতা খীসা। তিনি জানান, দীপ্তি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী অলংকার বাজারজাত করছেন। প্রতিটি অলংকারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা দীপ্তি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছেন। তাঁর এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।