অনেক অভিভাবকের মনেই এই প্রশ্নটি জাগে যে, খতনা করানোর সময় শিশুকে কি পুরোপুরি অজ্ঞান করতে হয়, নাকি শুধু অপারেশনের স্থানে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিলেই চলে?

মুসলিম ছেলেশিশুদের জন্য খতনা বা সারকামসিশন একটি অত্যন্ত প্রচলিত ছোট অস্ত্রোপচার। তবে এই প্রক্রিয়ায় অ্যানেসথেসিয়া এবং অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে এবং সেই ঝুঁকিগুলো কমাতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।

খতনা করার জন্য সব রোগীর ক্ষেত্রে জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া বা সম্পূর্ণ অজ্ঞান করার প্রয়োজন হয় না। মূলত রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, মানসিক উদ্বেগ, অস্ত্রোপচারের ধরন এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে অ্যানেসথেসিয়ার পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়।

লোকাল অ্যানেসথেসিয়া: এই পদ্ধতিতে লিঙ্গের নির্দিষ্ট স্নায়ু বা অস্ত্রোপচারের স্থানটি অবশ করা হয়, যাতে কাটাছেঁড়ার সময় শিশু ব্যথা অনুভব না করে। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি উপযুক্ত ক্ষেত্রে শিশুদের খতনায় এটি ব্যবহার করা যায়। একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে সঠিক পদ্ধতিতে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করলে অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপদে খতনা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

হালকা ঘুমের ওষুধ (সেডেশন): কিছু শিশু বা রোগীর ক্ষেত্রে ভয়, উদ্বেগ কিংবা স্থির হয়ে থাকতে অসুবিধা হলে সেডেশন বা ঘুম পাড়িয়ে রাখার প্রয়োজন হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সেডেশনও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়; এর ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস ও অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে। তাই এই প্রক্রিয়ার সময় উপযুক্ত পর্যবেক্ষণ ও জরুরি ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া: এই পদ্ধতিতে রোগীকে সম্পূর্ণ অচেতন করা হয়। খুব ছোট শিশু, যারা সহযোগিতা করতে অক্ষম রোগী, বিশেষ শারীরিক অবস্থা কিংবা অস্ত্রোপচারের বিশেষ প্রয়োজন অনুসারে এটি বিবেচনা করা হয়। তবে শুধু খতনা করানোর জন্য প্রত্যেক শিশুকে অজ্ঞান করতে হবে—এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই।

খতনা সাধারণত একটি নিরাপদ প্রক্রিয়া হলেও এর কিছু সম্ভাব্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন—রক্তপাত, সংক্রমণ, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া, অতিরিক্ত বা অপর্যাপ্ত চামড়া কাটা এবং বিরল ক্ষেত্রে লিঙ্গের আশপাশের টিস্যুতে আঘাত লাগার সম্ভাবনা থাকে।

লোকাল অ্যানেসথেসিয়ার ক্ষেত্রেও ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, ফোলা বা রক্তক্ষরণ হতে পারে। ভুল ও অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগের ফলে বিরল ক্ষেত্রে লোকাল অ্যানেসথেটিক সিস্টেমিক টক্সিসিটি দেখা দিতে পারে, যা স্নায়ুতন্ত্র ও হৃদ্‌যন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে।

অন্যদিকে, জেনারেল অ্যানেসথেসিয়ায় শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, বমি, অ্যালার্জিসহ অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে একজন প্রশিক্ষিত অ্যানেসথেসিয়া টিম এবং যথাযথ পর্যবেক্ষণ এসব ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

খতনার আগে শিশুর বা রোগীর পূর্ণাঙ্গ শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করা আবশ্যক। জন্মগত লিঙ্গের অস্বাভাবিকতা, রক্তক্ষরণজনিত রোগ, ওষুধে অ্যালার্জি, চলমান সংক্রমণ অথবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অসুস্থতা থাকলে তা অবশ্যই চিকিৎসককে জানাতে হবে। কিছু জন্মগত অস্বাভাবিকতার ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতিতে খতনা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

অস্ত্রোপচারের জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও উপযুক্ত চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহারের সময় রোগীর ওজন ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী নিরাপদ ওষুধ নির্বাচন এবং সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা মেনে চলা জরুরি। পাশাপাশি ব্যবহৃত ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মোকাবিলার প্রস্তুতিও থাকতে হবে।

জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি, পরিষ্কার পরিবেশ ও সঠিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া বা সেডেশন প্রয়োজন হলে যথাযথ মনিটরিং, অক্সিজেন, শ্বাসনালি ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পুনরুজ্জীবন সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখতে হবে। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়ার আগে বেশ কয়েক ঘণ্টা না খেয়ে থাকা সংক্রান্ত নির্দেশনাও অ্যানেসথেসিয়া টিমের পরামর্শ অনুযায়ী কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

খতনার পর যদি অতিরিক্ত রক্তপাত, জ্বর, পুঁজ, ব্যথা বা ফোলা ক্রমে বেড়ে যায় কিংবা প্রস্রাব করতে অসুবিধা হয়, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

খতনার ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য শুধু অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা নয়, বরং ব্যথামুক্ত ও নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। অনেক ক্ষেত্রে লোকাল অ্যানেসথেসিয়াই যথেষ্ট, তবে সব রোগীর জন্য একই পদ্ধতি উপযুক্ত নয়।

পরিশেষে, রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং প্রয়োজনে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের পরামর্শে অ্যানেসথেসিয়ার পদ্ধতি নির্ধারণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।