দেশের নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এই উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন।

জরিপের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ। বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার অনেক বেশি, যা দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এই উচ্চমাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সিসা সরাসরি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এর প্রভাবে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, মনোযোগের অভাব, শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা এবং আচরণগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ক্ষতির লক্ষণ সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে বাহ্যিকভাবে সুস্থ মনে হলেও ভেতরে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

দেশের বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে পরিচালিত গবেষণাতেও শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পরীক্ষায় কম স্কোর পাওয়ার একটি স্পষ্ট সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর ডব্লিউএইচওর উদ্যোগে ১৪তম আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধে’।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা বিদ্যমান। অর্থাৎ, এই বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসার মাত্রা নির্ধারিত সীমার সমান বা তার ওপরে।

‘সোশ্যাল প্যাটার্নিং অব এলিভেটেড ব্লাড লিড অ্যামাং চিলড্রেন এজড ১২-৫৯ মান্থস ইন বাংলাদেশ: অ্যা ন্যাশনাল ক্রস-সেকশনাল অ্যানালাইসিস অব মিকস ২০২৫’ শিরোনামের এই গবেষণাটি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান। চলতি মাসের ১৪ তারিখে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মেডআর্কাইভে এটি প্রকাশিত হয়।

গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল-ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এই জরিপে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

মিকসের এই প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের রক্তে সিসাসহ কয়েকটি ভারী ধাতুর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকেরা নতুন করে রক্ত পরীক্ষা না করে জরিপে আগে থেকে সংগৃহীত রক্ত পরীক্ষার ফল এবং পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নতুন পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ চালিয়েছেন।

জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী মোট ১৮ হাজার ৯০৫ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্তে সিসার পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। বিভিন্ন আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে করা মূল বিশ্লেষণে চূড়ান্তভাবে ৯ হাজার ৭১৭ শিশুর সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা থাকলে তাকে উচ্চমাত্রা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। গবেষকেরা পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসবাসের এলাকা, ঘরের অবস্থা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সিসার উচ্চমাত্রার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসার মাত্রা নির্ধারিত সীমায় বা তার ওপরে। তবে পরিবারের সম্পদ অনুযায়ী এই হারে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। সম্পদ অনুযায়ী শিশুদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হলে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ, আর সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে তা ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ।

ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে, তারা প্যাকেটজাত খাবার বেশি গ্রহণ করে। এছাড়া তাদের বাসায় আসবাবপত্র, দেয়ালের রং এবং বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্রের আধিক্য থাকে, যেগুলোতে সিসা থাকতে পারে। ফলে এসব পণ্যের সংস্পর্শে এসে শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়। দুই শ্রেণির মধ্যে এই ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট, যা নির্দেশ করে যে দরিদ্রদের তুলনায় ধনীদের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, পরিবারের সম্পদের স্তর যত বৃদ্ধি পায়, শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হারও তত বাড়ে। পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষা ও ঘরের অবস্থা বিবেচনা করার পরও এই সম্পর্ক অপরিবর্তিত থাকে।

ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ধনী শিশুরা প্যাকেটজাত খাবার বেশি খেতে পারে। এ ছাড়া তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন ধরনের তৈজস বেশি থাকে। এসব পণ্যে সিসা থাকতে পারে। ফলে পণ্যগুলোর সংস্পর্শ শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের সম্ভাব্য পথ হতে পারে।” তবে গবেষণায় এসব উৎস আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি, তাই সরাসরি প্যাকেটজাত খাবার বা রঙের কারণেই মাত্রা বেশি—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাও মনে করেন, ধনী পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তিনি বলেন, “ধনী পরিবারের শিশুরা আমদানি করা খেলনা বেশি পায়। বাসায় সাজসজ্জার নানা সামগ্রীও থাকে। এ ছাড়া পোলট্রির মুরগিকে দেওয়া খাবারে সিসা থাকতে পারে। অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন পরিবারের অনেক শিশু মুরগির মাংস বেশি খায়। এসব খাবারের মাধ্যমেও তাদের শরীরে সিসা প্রবেশ করা অস্বাভাবিক নয়।”

উচ্চমাত্রার সিসার সংস্পর্শে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে, তবে কম মাত্রার সংস্পর্শেও শিশুর বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিসা মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করে এবং অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুর কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। অনেক সময় এর ফলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও কমে যায়। সিসা শরীরে প্রবেশের পর রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি ও হাড়সহ বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, তাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র তখনো বিকাশের পর্যায়ে থাকে।

এর ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা হ্রাস, মনোযোগের অভাব, শেখার অসুবিধা ও আচরণগত পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষাগত অর্জনে প্রভাব ফেলে। এছাড়া সিসার সংস্পর্শ রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শিশুর শরীরে সিসার ক্ষতি হয়েছে কি না, তা শুধু বাহ্যিক চেহারা বা তাৎক্ষণিক উপসর্গ দেখে বোঝা যায় না।”

তিনি আরও বলেন, “উচ্চমাত্রার সিসার সংস্পর্শে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার সংস্পর্শেও শিশুর বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সিসা মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করতে পারে এবং অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুর কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। অনেক সময় হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও কমে যায়।”

অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা উভয়েই জানিয়েছেন, আগের তুলনায় স্নায়ুগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু তাঁদের কাছে বেশি আসছে।

বাংলাদেশে শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি ও প্রভাব নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০১৬ সালে এনভায়রনমেন্টাল হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সিরাজদিখান ও পাবনার ৫২৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। ২০ থেকে ৪০ মাস বয়সী শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা পরিমাপের পাশাপাশি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মোটর বিকাশ মূল্যায়ন করা হয়। সেখানে সিরাজদিখানের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায় এবং এর সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পরীক্ষায় কম স্কোর পাওয়ার সম্পর্ক দেখা যায়। তবে গবেষকেরা একে কেবল একটি সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন; প্রতিটি শিশুর বিকাশজনিত সমস্যার একমাত্র কারণ সিসা—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।

২০২০ সালে জার্নাল অব নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারস সাময়িকীতে প্রকাশিত ৭৩৪ শিশুর আরেকটি গবেষণায় জন্মের সময় নাড়ির রক্তে সিসার মাত্রা এবং দুই থেকে তিন বছর বয়সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতির শিশুদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সিসার সংস্পর্শের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক স্কোর কমার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, অপুষ্টি শিশুদের সিসার ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে।

শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার ক্ষেত্রে বিভাগভেদে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫ সালের মিকসের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকায় ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিলেটে এই হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে বরিশালে ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

গবেষকদের সমন্বিত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণেও বিভাগীয় পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। বরিশালকে তুলনার ভিত্তি ধরে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সঙ্গে বেশি সম্পর্ক এবং রাজশাহীতে কম সম্পর্ক বিদ্যমান।