বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সংস্থা ইউনিসেফ এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।
গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংস্থাটি জানিয়েছে, অল্প বয়সে বিয়ের ফলে মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক ভবিষ্যৎ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করার পাশাপাশি মেয়েদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে তিন দিনের সফর শেষ করে তিনি শিশুদের কল্যাণে তিনটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
ক্যাথরিন রাসেলের চিহ্নিত সেই তিনটি পদক্ষেপ হলো— বাল্যবিবাহ রোধ করে মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা ও তাদের শিক্ষা নিশ্চিত করা; মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা; এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
সফরকালে ক্যাথরিন রাসেল ঢাকার কড়াইল বস্তির বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের বাস্তব জীবনসংগ্রামের কথা শোনেন। বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী বুশরার সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘বুশরা নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। সে আমাকে জানায়, ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের কমিউনিটি নেতারা তার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে তাকে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করেছেন।’
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক আরও উল্লেখ করেন, ‘মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে তা তাদের, তাদের কমিউনিটি এবং বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করবে।’
বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। এছাড়া একই বয়সী নারীদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।
ইউনিসেফের মতে, বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি অল্প বয়সে গর্ভধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় এবং জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে।
ঢাকা সফরের অংশ হিসেবে ক্যাথরিন রাসেল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠকে তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সরকারি অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন এবং তা দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
রাসেল বলেন, ‘বাজেটের মধ্য দিয়েই অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সুরক্ষায় বিনিয়োগ মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।’
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করে রাসেল বলেন, ‘সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা অনেক কিছু হারিয়েছে। এখন তাদের শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হতে হবে, এটা হতে দেওয়া যাবে না। তাদের এবং যে কমিউনিটি তাদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের জন্য বিশ্বকে অবশ্যই বিনিয়োগ করতে হবে।’