কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং রোবোটিকসের এই আধুনিক যুগেও দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা মেয়েদের বিয়ের আইনি বয়সসীমা কমিয়ে আনার বিষয়ে যুক্তি প্রদর্শন করছেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
আজ সোমবার রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা) এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘হার স্কিলস, হার ফিউচার’ শীর্ষক প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে এই আয়োজন করা হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘এখন এমন বড় বড় রাজনৈতিক দল আছে, যাদের বড় বড় নেতারা দিনরাত যুক্তি দিচ্ছেন যে কত অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার আইনি বয়সসীমা নামিয়ে আনা উচিত। অথচ আজকের এই যুগে এসে যখন এআই ও রোবোটিকস বিশ্বজুড়ে সবকিছু চালিত করছে, তখন আমাদের দেশে রাজনৈতিক আলোচনা হচ্ছে বিয়ের বয়স কত কমিয়ে নিয়ে আসা যায়।’
বাল্যবিবাহ রোধে কেবল আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে নারীর ক্ষমতায়নই যে সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি, সেই বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন যে, সত্তর বা আশির দশক থেকে দেশে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স কেবল আইনের কারণে বাড়েনি, বরং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ফলেই এই পরিবর্তন এসেছে। নারীদের অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই সমাজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নারীরা এখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন যে তাঁরা এত দ্রুত বিয়ে করবেন না। এই বাস্তবতায় নারীদের সঠিক ক্ষমতায়ন এবং সঠিক তথ্যের প্রসার অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা সুবিধাবঞ্চিত ও গ্রামীণ নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি তাঁদের যোগাযোগদক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবারকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেন।
অনুষ্ঠানে ইউনিসেফ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ জানান, এই যৌথ উদ্যোগের ফলে প্রায় ১৭ হাজার কিশোরীর জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত হয়েছে। দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা এখন নিয়োগকর্তা, সমাজ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত হতে পারবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মেয়েদের বাস্তবমুখী দক্ষতা তৈরিতে ইউনিসেফ, কোইকা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (বিএনএফই) যৌথভাবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতে এই সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
কোইকা বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম বলেন, এই প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে তরুণীদের দক্ষতা ও সম্ভাবনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন। অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার মাধ্যমেই এই প্রকল্পের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ‘হার স্কিলস, হার ফিউচার’ প্রকল্পের আওতায় মোট ৪২ জন ‘মাস্টার ট্রেইনার’কে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তাঁদের মধ্য থেকে প্রতীকী হিসেবে দুজনের হাতে সম্মাননা স্মারক (ক্রেস্ট) তুলে দেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। আয়োজকরা জানান, বাকি ৪০ জন প্রশিক্ষকের কাছেও সনদ ও ক্রেস্ট পৌঁছে দেওয়া হবে।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শঙ্করের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো এবং বিভিন্ন দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।