বিশ্বের যেসব দেশে বাল্যবিবাহের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, তাদের তালিকায় অন্যতম হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি এই দেশেই।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-এর সংস্কারের লক্ষ্যে পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্যগুলো সামনে এসেছে। উল্লেখ্য যে, বাল্যবিবাহ নিরসনে পরিচালিত বৈশ্বিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথভাবে ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই কন্যাশিশুদের বিয়ে হওয়ার হার ছিল ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই হার কিছুটা কমে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সামান্য অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশে এখনো আনুমানিক ৪ কোটি ১৬ লাখ বাল্যবধূ রয়েছেন। এর মধ্যে ২ কোটি ২৩ লাখ কন্যাশিশুর বিয়ে হয়েছে তাদের বয়স ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।
বাল্যবিবাহের পেছনে মূল কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে দারিদ্র্য, ক্ষতিকর সামাজিক ও জেন্ডারভিত্তিক রীতিনীতি, মানসম্মত শিক্ষার অভাব, কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতি এই সংকটগুলোকে আরও ঘনীভূত করছে। ফলে অনেক অসহায় পরিবার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় হিসেবে অল্প বয়সেই তাদের কন্যাশিশুদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বাল্যবিবাহের ফলে কন্যাশিশুদের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ছে, যা তাদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সাম্প্রতিক জাতীয় তথ্যের ইঙ্গিত অনুযায়ী, দেশে কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সরকার বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন (সিএমআরএ) ২০১৭ এবং ২০১৮ সালের বিধিমালার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক অঙ্গীকার দেখিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় হেল্পলাইনের ব্যবহার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে প্রতিবেদনে এই বিষয়ে একটি বড় সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান আইনের কিছু ফাঁকফোকর এবং বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে আইনের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ছে। তাই বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষা এবং বাল্যবিবাহ নিরসনের লক্ষ্য অর্জনে আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আইনের ধারাবাহিক, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত প্রয়োগ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।