নওগাঁয় প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় তাঁর ছোট বোন বা শ্যালিকাকে বিয়ে করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন এক যুবক। অবশেষে সেই দ্বিতীয় স্ত্রী ওই যুবককে তালাকের নোটিশ দিয়েছেন। বুধবার বিকেলে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে ঘটনার জন্য সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর পাঠানো তালাকের নোটিশের একটি কপি ফেসবুকে পোস্ট করেন ওই যুবক।
জানা গেছে, নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা ওই যুবক পেশায় নওগাঁ আদালতের একজন আইনজীবীর সহকারী। তিনি প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে জেলার বদলগাছী উপজেলা সদরের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। গত ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় তিনি প্রথম স্ত্রীর ছোট বোনকে বিয়ে করেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনা শুরু হলে তিনি দাবি করেছিলেন যে, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে তিনি এই বিয়েটি করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি জানাজানির পর ইসলামি বিধান অনুযায়ী ‘একসঙ্গে দুই বোনকে বিয়ে করার বিধান নেই’—এই কথা উল্লেখ করে বদলগাছীতে তাঁরা যে ভাড়া বাসায় থাকতেন, সেটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়। একপর্যায়ে এলাকাবাসীর প্রচণ্ড ক্ষোভের মুখে পড়ে তাঁরা গত সোমবার রাতে নিজেদের সমস্ত আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র নিয়ে মহাদেবপুর উপজেলায় শ্বশুরবাড়িতে চলে যান। তবে সেখানেও শান্তি পাননি তাঁরা। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন যে, ‘এই বিয়ের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে’। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাঁদের মারধর করা হয় এবং মুখে চুনকালি মাখিয়ে ও গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
এর পরবর্তী পর্যায়ে গত মঙ্গলবার ওই যুবক ফেসবুক লাইভে এসে প্রথমে সবার কাছে ক্ষমা চান। তিনি স্বীকার করেন যে, শ্যালিকাকে বিয়ে করা তাঁর একটি বড় ভুল ছিল। পাশাপাশি তিনি ঘোষণা দেন যে, দুই স্ত্রীর মধ্যে একজনকে তিনি তালাক দেবেন। তবে কাকে তালাক দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে জানাননি তিনি। পরিবারের সঙ্গে আলোচনার পর বুধবার বিকেল পাঁচটায় লাইভের মাধ্যমে বিষয়টি জানানোর কথা বলেন।
আজ বুধবার বিকেল পাঁচটার দিকে পুনরায় ফেসবুকে লাইভে এসে ওই যুবক বলেন, ‘আমরা যে ভুল করেছি, সেটা নিয়ে ইসলামের ওপর প্রভাব পড়েছিল। সেইটা আমরা অলরেডি সমাধান করেছি। আপনারা আমার আইডিতে ঢুকলে বুঝতে পারবেন। অলরেডি ...(দ্বিতীয় স্ত্রী) আমাকে ডিভোর্স দিয়েছেন। ডিভোর্সের পেপারটা আমি আমার আইডিতে দিয়েছি।’
একসঙ্গে দুই বোনকে বিয়ে করা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ—এই বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। যুবকটি বলেন, ‘মানুষ মাত্রই ভুল করে। ভুলের জন্য আমি গোটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাইছি। না বোঝার কারণে ভুলটা হয়ে গেছে। এ জন্য ইতিমধ্যে আমরা অনেক অপমান, অনেক লাঞ্ছিত হয়েছি। ইসলামি শরিয়তে দুই বোনকে বিয়ে করা জায়েজ নয়, এটা আমার জানা ছিল না।’
লাইভের শেষ দিকে তিনি আরও বলেন, ‘আমি ভুল করে শিক্ষা নিয়েছি। ভবিষ্যতে আমার মতো আর কেউ না বুঝে এমন সিদ্ধান্ত নেবেন না।’
ওই যুবক তাঁর ফেসবুক আইডিতে তালাকের নোটিশের একটি কপি পোস্ট করেছেন। নোটিশে স্বাক্ষরকারী কাজী সামিদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বাবার সঙ্গে ওই মেয়ে আজ দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে এসেছিলেন। মেয়ে ও তাঁর অভিভাবকদের পূর্ণ সম্মতিতে তালাকের নোটিশ জারি করা হয়েছে। এই নোটিশের একটি কপি স্বামীর কাছে এবং অপরটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হবে। তিন মাস পর এই তালাক কার্যকর হবে।
বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে ওই যুবকের শ্বশুর মুক্তকণ্ঠকে জানান, তাঁর বড় মেয়ের স্বামী যে ছোট মেয়েকে বিয়ে করেছেন, তা তিনি জানতেন এবং বড় মেয়েরও এতে সম্মতি ছিল। একজন মৌলভি ডেকে বদলগাছীর ভাড়া বাড়িতেই গত রোববার তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে একসঙ্গে দুই বোনকে বিয়ে করা যায় না—এই বিষয়টি তাঁরা জানতেন না। ফেসবুকে বিষয়টি জানাজানির পর এলাকার মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তাঁরা চরম হেনস্তার শিকার হন। মঙ্গলবার বিকেলে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে সবার সামনে ছোট মেয়ে তাঁর স্বামীকে তালাক দেওয়ার ঘোষণা দেন। এই বিষয়ে এলাকার লোকজন মেয়ের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে নেন।