নওগাঁয় প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় আপন শ্যালিকাকে বিয়ে করার ঘটনা সামনে আসায় এক যুবক ও তাঁর দুই স্ত্রীকে চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। তাঁদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার রাতে জেলার মহাদেবপুর উপজেলার একটি গ্রামে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে। পুরো ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী যুবক (৩৫) নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন আইনজীবীর সহকারী। গত রোববার সন্ধ্যায় তিনি তাঁর ২১ বছর বয়সী শ্যালিকাকে বিয়ে করেন। এর আগে তাঁরা জেলার বদলগাছী উপজেলা সদরে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে এক যুবক ও দুই নারীকে ঘিরে ধরেছেন প্রচুর মানুষ। যুবকটিকে একজন ধরে রেখেছেন এবং অন্য এক নারী তাঁদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিচ্ছেন। সেই মুহূর্তে উপস্থিত ভিড়ের মধ্যে অনেকের মুখে ‘চুনকালি, চুনকালি’ বলে উল্লাস করার শব্দ শোনা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আপন দুই বোনকে বিয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। ধর্মে ‘একসঙ্গে দুই বোনকে বিয়ে করার বিধান নেই’—এই কথা উল্লেখ করে বদলগাছীর ভাড়া বাসাটি ছেড়ে দেওয়ার চাপ দেওয়া হয় তাঁদের ওপর। স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে ওই যুবক তাঁর দুই স্ত্রীকে নিয়ে গতকাল রাতে মহাদেবপুর উপজেলায় শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দুই স্ত্রীকে নিয়ে ওই যুবক শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন—এই খবর জানাজানি হতে হতে রাত ১০টার দিকে সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হন। এই ধরনের বিয়ে তরুণ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অভিযোগ করে তাঁদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা তাঁদের মারধর করে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়।
ভুক্তভোগী যুবকের শ্বশুর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তাঁর দুই মেয়ে ও জামাতা গতকাল রাত আটটার দিকে তাঁর বাড়িতে আসেন। খবর পেয়ে গ্রামের কিছু লোক বাড়িতে এসে তাঁদের নানাভাবে হেনস্তা করেন। একপর্যায়ে গ্রাম থেকে চলে যেতে বলেন। পরে তাঁরা তাঁর জামাতা ও মেয়েদের মারধর করে মুখে চুনকালি মাখিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেন। তাঁরা এখন এক আত্মীয়র বাড়িতে উঠেছেন।”
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের বেলা এক যুবক ও দুই নারীকে ঘিরে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। যুবকটিকে ধরে রাখা অবস্থায় এক নারী তাঁদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিচ্ছেন এবং উপস্থিত লোকজন ‘চুনকালি, চুনকালি’ বলে চিৎকার করছেন। গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার সময় কিছু লোক লাঠিসোঁটা দিয়ে ওই যুবককে মারধর করতে দেখা গেছে।
ইসলামিক বিধান অনুযায়ী, একসঙ্গে আপন দুই বোনকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ। প্রথম স্ত্রী জীবিত এবং তাঁর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলে তাঁর আপন বোনকে বিয়ে করা নাজায়েজ।
নওগাঁ জেলা ইমাম-মুয়াজ্জিন পরিষদের সাবেক সভাপতি মাওলানা আকরাম হোসেন এই বিষয়ে জানান, ইসলামের বিধান অনুসারে একসঙ্গে আপন দুই বোনকে বিয়ে করা যায় না। তিনি বলেন, “প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকলে এবং তাঁর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় তাঁর আপন বোনকে বিয়ে করা নাজায়েজ। কিন্তু প্রথম স্ত্রী মারা গেলে কিংবা তাঁর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে শ্যালিকাকে বিয়ে করা যাবে।”
জানা গেছে, ভুক্তভোগী যুবক ও তাঁর দুই স্ত্রীর বেশ কিছু টিকটক ভিডিও রয়েছে। তবে এই বিষয়ে কথা বলতে ওই যুবকের মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়, ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে দুই স্ত্রীর কারও সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মহাদেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক জানান, ফেসবুকে ভিডিও দেখে তিনি ওই যুবক ও তাঁর দুই স্ত্রীকে হেনস্তার বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে এখনো কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা অভিযোগ করলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”