দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার মুখে অবশেষে নওগাঁয় মাথা নত করলেন মাসুদের দ্বিতীয় স্ত্রী পূর্ণিমা এবং তার বাবা মান্নান সাপুড়ে। স্ত্রীর ছোট বোন অর্থাৎ শ্যালিকাকে বিয়ে করার ঘটনায় গ্রামবাসীর তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে তারা ক্ষমা চেয়েছেন এবং তওবা করেছেন। এই সালিশ বৈঠকে অভিযুক্ত মাসুদ রানাও কান ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার রাইগা ইউনিয়নের নারায়নপুর (বিরমগ্রাম) এলাকায় মাসুদের শ্বশুরবাড়ির উঠানে এই বিশেষ সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত গ্রামবাসীর সামনে হাতজোড় করে ক্ষমা চান মান্নান সাপুড়ে।

বৈঠকে মাসুদের দ্বিতীয় স্ত্রী পূর্ণিমা উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে জানান, তার বোন মৌসুমী দীর্ঘ দিন সংসার করেছেন। শরিয়ত ও হাদিসের বিধান অনুযায়ী যেহেতু তাদের তালাক হয়ে যায়, তাই মাসুদ যেন পুনরায় তার বোন মৌসুমীকেই বিয়ে করে সংসার শুরু করে। পূর্ণিমা ঘোষণা করেন, তিনি মাসুদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখবেন না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের ভুল স্বীকার করে পূর্ণিমা ক্ষমা চেয়ে বলেন, “তার বোন এত বছর সংসার করেছেন, তিনিই আবার সংসার করুন।” পাশাপাশি তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি আর মাসুদের সঙ্গে কোনো টিকটক ভিডিও তৈরি করবেন না এবং কোনো ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না। গ্রামবাসীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন যেন তাদের এই বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা না হয়। তিনি নিজের মতো করে শান্তিতে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।

পূর্ণিমার বাবা মান্নান সাপুড়ে এসময় বলেন, “যা কিছু হয়েছে, তার জন্য আমি সবার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাই। তবু আমাদের বসতবাড়ি থেকে তুলে দেবেন না।” এই অঙ্গীকার করার সময় তিনি সবার সামনে কান ধরে এবং মাটি ছুঁয়ে নাকে দিয়ে তওবা করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, “আমি আগে খারাপ ছিলাম, আপনাদের সবার শাসনে আমি এখন ভালো হব।”

ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, নওগাঁর বদলগাছী সদর ইউনিয়নের বৈরাগীপাড়ায় প্রথম স্ত্রী মৌসুমীকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন মাসুদ রানা। গত ২৪ অক্টোবর ওই বাসায় দুলাভাই মাসুদ ও শ্যালিকা পূর্ণিমার গায়েহলুদ সম্পন্ন হয় এবং পরদিন ২৫ অক্টোবর তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

ইসলামি অনুশাসনের পরিপন্থী এবং অনৈতিকভাবে দুই আপন বোনকে একই সঙ্গে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। এর ফলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে মহাদেবপুর উপজেলার মাতাজি বিরামগ্রাম এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতিতে শ্যালিকাকে বিয়ে করার প্রতিবাদে স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা ওই টিকটকার ও আইনজীবী সহকারী মাসুদকে আটক করেন। গ্রামবাসী তাদের মুখে চুন-কালি মাখিয়ে এলাকা থেকে বের করে দেয়।

পরবর্তীতে ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার ফেসবুকে লাইভে এসে জাতির কাছে ক্ষমা চান মাসুদ এবং প্রথম স্ত্রী মৌসুমীকে রেখে আপন শ্যালিকা পূর্ণিমাকে তালাক দেওয়ার ঘোষণা দেন।

উক্ত সালিশ বৈঠকে রাইগা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নং ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আশরাফুল ইসলাম, বর্তমান সদস্য আখতার হোসেন এবং স্থানীয় লোকমান রেজোয়ান আরিফসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

শরিয়তের বিধান সম্পর্কে নওগাঁ জেলা ইমাম-মুয়াজ্জিন পরিষদের সাবেক সভাপতি মাওলানা আকরাম হোসেন জানান, ইসলামের বিধান অনুযায়ী একসঙ্গে দুই আপন বোনকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, “প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকলে এবং তার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় তার আপন বোনকে বিয়ে করা নাজায়েজ। কিন্তু প্রথম স্ত্রী মারা গেলে কিংবা তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে আপন শ্যালিকাকে বিয়ে করা যাবে।”