ময়মনসিংহের ভালুকায় এক নৃশংস হামলায় রবীন্দ্র ঋষি নামের এক সেলুনমালিক নিহত হয়েছেন। নিহতের মরদেহ পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, তাঁর গলা, কণ্ঠনালি, বুক, পিঠ ও হাতে অন্তত ১০টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

নিহত রবীন্দ্র ঋষির বয়স ৪২ বছর। তিনি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট এলাকায় ‘অপূর্ব হেয়ার কাটিং’ নামক একটি সেলুনের মালিক ছিলেন। তিনি পাশের জামিরদিয়া এলাকায় নোমান কম্পোজিট ফ্যাক্টরির পাশে একটি ভাড়া বাসায় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করতেন।

গ্রেপ্তার করা যুবক সাদ্দাম হোসেনের (২৮) বয়স ২৮ বছর এবং তিনি ওই এলাকারই বাসিন্দা। তাঁর বাবার একটি মুদিদোকান রয়েছে, যেখানে তিনি মাঝেমধ্যে বসতেন। আজ দুপুরে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আদালত আগামী ১ নভেম্বর রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

নিহত রবীন্দ্রর স্ত্রী সুচিত্রা রানী ঋষি জানান, সাদ্দাম প্রায়ই তাঁর স্বামীর কাছ থেকে নেশার জন্য টাকা নিতেন। এমনকি সেলুনে চুল কাটিয়েও তিনি টাকা পরিশোধ করতেন না। টাকা না দেওয়া এবং চুল কেটে না দেওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। সুচিত্রা আরও জানান, কিছুদিন আগে সাদ্দাম রবীন্দ্রকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রর মা সুলক রানী ঋষি বাদী হয়ে গতকাল রাতে ভালুকা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় সাদ্দামকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার দিকে রবীন্দ্র তাঁর সেলুনে বসে ভায়রা ভাই মানিক ঋষির সঙ্গে কথা বলছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে সাদ্দাম একটি ধারালো ছুরি নিয়ে সেলুনে প্রবেশ করেন এবং রবীন্দ্রর গলায় উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকেন। প্রাণ বাঁচাতে রবীন্দ্র পাশের একটি দোকানে আশ্রয় নিলেও সাদ্দাম সেখানে গিয়ে তাঁর বুকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর রবীন্দ্র পাশের একটি বাড়ির উঠানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলে সাদ্দাম তাঁকে মাটিতে ফেলে দিয়ে বুক, পিঠ ও হাতে ছুরিকাঘাত করেন। এই নির্মম আঘাতে রবীন্দ্রর মৃত্যু হয় এবং ঘটনার পর সাদ্দাম এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।

ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, গতকাল রাতেই সাদ্দামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২৫০ মিটার দূরে উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতের গলা, কণ্ঠনালি, বুক ও পিঠে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং আঘাতের সংখ্যা ১০টির কম নয়।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও সাদ্দামের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যানুসারে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে চুল কাটার টাকা নিয়ে নিহত ব্যক্তি ও আসামির মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সাদ্দাম রবীন্দ্রর স্ত্রীকে ধর্মের বোন বানানোর আগে থেকেই তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন এবং তাঁদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের মতো ঘনিষ্ঠতা ছিল। কিছুদিন আগে সাদ্দাম হাতখরচের কথা বলে রবীন্দ্রর কাছ থেকে এক হাজার টাকা নিয়েছিলেন। সেই টাকা ফেরত না দেওয়ায় রবীন্দ্র সাদ্দামের বাবার কাছে বিচার চেয়েছিলেন। এর মধ্যে পূজার সময় সাদ্দাম ওই সেলুনে চুল কাটাতে গেলে রবীন্দ্র তাঁকে চুল কেটে দিতে রাজি হননি। এসব বিষয়ে সাদ্দাম অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং সেই ক্ষোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হত্যার বিষয়ে আসামি কী জানিয়েছেন, এমন প্রশ্নে ওসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আসামি পাগলাটে আচরণ করছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”