মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ করে ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনটি শূন্য হওয়ার পর সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দুই প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। বুধবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী পৃথক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন, যেখানে তারা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, কর্মী ও সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাব বিস্তারের মতো নানা অভিযোগ উত্থাপন করেন। তবে উভয় পক্ষই নিজেদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

আগামী বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ চলবে। এই নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রে থাকা ৯৮৯টি ভোটকক্ষে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

নির্বাচন প্রক্রিয়া নিরাপদ ও সুষ্ঠু করতে ২১ প্লাটুন বিজিবি, ২ হাজার ২৭২ জন পুলিশ সদস্য এবং ২ হাজার ৪০৫ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটি এবং বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা উপস্থিত থাকবেন। নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে চারজন বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ মোট ১৭৭ জন দেশি-স্থানীয় পর্যবেক্ষক নিয়োজিত থাকবেন।

বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শহরের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রচারণার শুরু থেকেই বিএনপির নেতা-কর্মীরা দাঁড়িপাল্লার কর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছেন ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। এমনকি বিভিন্ন স্থানে তাঁর গণসংযোগ কার্যক্রমেও বাধা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

দেলাওয়ার হোসেন আরও অভিযোগ করেন, বিএনপির প্রার্থী গণসংযোগের সময় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে এলজিইডির কর্মকর্তাকে ফোন করে এক মাসের মধ্যে একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর কথা বলেছেন এবং অন্য একটি স্থানে অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ১৩ অক্টোবর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগের সময় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁকে বাধা দেন এবং লাঞ্ছিত করেন। এছাড়া ২০ অক্টোবর আখানগরে জামায়াতের একটি নির্বাচনী সভা শেষে বিএনপির নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়ে তাঁদের একজন কর্মীকে আহত করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

জামায়াতের এই প্রার্থী আরও অভিযোগ করেন, সরকারি চাকরিজীবীরা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে না পারলেও ২৪ ও ২৫ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের দিয়ে বিএনপি তিনটি চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করেছে। এ ছাড়া ভোটারদের কাছে পরিবার কার্ড, কৃষি কার্ড, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাওয়া এবং ভোটার স্লিপ দেওয়ার সময় টাকা বিতরণের অভিযোগও করেন তিনি।

দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আরও বলেন, “এসব বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিচারিক অনুসন্ধান কমিটির কাছে তাঁরা অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত প্রতিকার পাননি। প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর আগামীকালের নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার বিষয়টি নির্ভর করছে।”

এই সংবাদ সম্মেলনে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আবদুল হাকিম, বর্তমান আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান, সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আলমগীর, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কফিল উদ্দিনসহ দলটির অনেক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে, বুধবার রাত নয়টার দিকে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিএনপি। সেখানে দলটির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বলেন, উপনির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করতে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ও ১১–দলীয় ঐক্যজোটের নেতা-কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে একের পর এক মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ করছেন। তিনি দাবি করেন, এসব অভিযোগ নির্বাচন কমিশন ও বিচারিক অনুসন্ধান কমিটির কাছে দেওয়া হলেও তদন্তের পর সেগুলোর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

বিএনপির এই প্রার্থী উল্লেখ করেন, সাধারণত উপনির্বাচনে ভোটারের আগ্রহ ও উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকে, কিন্তু ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে এই নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আর সেটি দেখে বিরোধী প্রার্থী নানা অপপ্রচারের মাধ্যমে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।

জামায়াতের প্রার্থীকে ইঙ্গিত করে মির্জা ফয়সল বলেন, “দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। নির্বাচনের আগের দিন সংবাদ সম্মেলন করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে হুমকি দিচ্ছেন। এ ধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণসহ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হলেও তাঁরা প্রতিকার পাননি বলে তিনি জানান।

মির্জা ফয়সল বলেন, “আমরা চাই দল-মত, শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিন। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।”

বিএনপির এই সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী, যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কামাল আনোয়ার আহাম্মদ, জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা পারভিন, জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মামুন উর রশিদসহ দলের অনেক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।