রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের সরকারি উদ্যোগটি শুরুতেই তীব্র বাধার মুখে পড়েছে। পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। এই প্রতিবাদেরই অংশ হিসেবে বুধবার ওই মাঠের ভেতরে নির্মাণাধীন দুটি মেলার স্থাপনা ভাঙচুর করেন শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এই মাঠের জায়গাটি মূলত তাঁদেরই। এখানে তাঁরা নিয়মিত কৃষিবিষয়ক গবেষণার কাজ পরিচালনা করেন। তাঁদের মতে, এই স্থানে সচিবালয় স্থাপন করা হলে একদিকে যেমন তাঁরা গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা হারাবেন, অন্যদিকে সামগ্রিক কৃষি গবেষণা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক পাশেই সচিবালয় গড়ে তুললে ভবিষ্যতে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।
তবে এই দাবির বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ওই জায়গা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা হিসেবে শিক্ষার্থীরা যে দাবি করছেন, সেটি সঠিক নয়। এটি গণপূর্তের নামে।” তবে শিক্ষার্থীরা কেন এমন দাবি করছেন, সে বিষয়ে খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বর্তমানে আবদুল গনি রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন এই জায়গায় সচিবালয়ের পূর্ণ কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই স্থানান্তরের ফলে পুরান ঢাকায় অবস্থিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং অধস্তন আদালতগুলোকে সচিবালয়ের বর্তমান জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আবদুল গনি রোডের ১৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গার ওপর বাংলাদেশ সচিবালয়ের মোট ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভবনই স্বাধীনতার আগে নির্মিত। বিশেষ করে সচিবালয়ের পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবনগুলো ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবনটি ১৯৪৭ সালে তৈরি করা হয়। এই ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা হয়নি। ঢাকা শহর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এসব পুরনো স্থাপনায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ভবনগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব থাকায় স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আরও জানিয়েছে, একনেক সভার সিদ্ধান্তের পর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থাপনের জন্য স্থাপত্য অধিদপ্তর একটি ধারণাগত নকশা তৈরি করেছে। এই নকশা অনুযায়ী, প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জায়গায় মোট ৩৩ দশমিক ১৬ লাখ বর্গফুট আয়তনের স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এখানে তিনটি বেসমেন্টসহ ১৪টি ১২তলা ভবন থাকবে। মোট ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে, যার মধ্যে ২০০টি হবে ভূ-উপরিস্থ। এছাড়া একটি মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতার দুটি বহুমুখী হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া এবং একটি ডাকঘরসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় সবুজায়ন ও জলাধারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন জায়গায় সচিবালয় নির্মাণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে বর্তমানে পাশাপাশি দুটি মেলার আয়োজন চলছিল। সেখানে মাসব্যাপী ‘এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা’র প্রস্তুতি চলছিল এবং পাশেই এক সপ্তাহব্যাপী ‘যুব মেলা’র আয়োজন করা হয়েছিল। এই মেলা দুটির জন্য মাঠে ফটক ও বিভিন্ন স্টল নির্মাণ করা হচ্ছিল। গতকাল দুপুরের আগে শেকৃবির শতাধিক শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে মেলার স্থাপনাগুলো ভাঙচুর করেন। এর আগের দিনও তাঁরা এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
গতকাল বিকেলে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁদের দাবি, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি। আশির দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে মেলার জন্য সাময়িকভাবে জায়গাটি নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা আর বিশ্ববিদ্যালয়কে ফেরত দেওয়া হয়নি। এই জায়গাটি পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে তাঁরা জানান।
তবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে জানান, মন্ত্রিসভায় যেহেতু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাই জায়গার মালিকানা ও অবস্থান সম্পর্কে ভালোভাবে জেনেবুঝেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ২৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডাকার এবং এই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করার দাবি জানানো হয়েছে।
চিঠিতে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তি এবং কৃষি গবেষণার জন্য এটি অত্যন্ত মৌলিক ও অপরিহার্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁরা এই গবেষণার মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। তাঁদের মতে, ঢাকার মতো জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরের প্রাণকেন্দ্রে সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত পরিবেশগত দিক থেকে চরম অপরিণামদর্শী এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান ও কৃষি গবেষণার জন্য মারাত্মক হুমকি।
এই কারণে তিন দিনের মধ্যে জরুরি সিন্ডিকেট সভা করে মাঠটিকে শেকৃবির নিজস্ব গবেষণার মাঠ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি রক্ষায় হাইকোর্টে রিট আবেদন করার ব্যবস্থা নিতে দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেকৃবির এক শিক্ষার্থী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও একাধিক সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে সচিবালয় স্থাপন করা হলে এসব হাসপাতালের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের প্রতিবাদ চলবে। তাঁরা কোনোভাবেই সেখানে সচিবালয় হতে দেবেন না।”