একদা নাহিদুর রহমানের কোলে মাথা রেখেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তার জন্মদাত্রী মা। ক্যানসারের সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মায়ের সেই প্রয়াণে শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো পরিবার। কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, একদিন সেই মায়ের কবরের পাশেই পাশাপাশি শায়িত হতে হবে নাহিদুর রহমান, তার স্ত্রী এবং দুই শিশুকন্যাকে। কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের এই চার সদস্যের করুণ মৃত্যু হয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে যশোরের মনিরামপুর পৌর শহরের মোহনপুরে অবস্থিত বাঁধাঘাট ঈদগাহ মাঠে জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। পাশাপাশি চারটি কবরে চিরবিদায় জানানো হয় নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজী (৩৬) এবং তাদের দুই ছোট মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৭) ও মুনাইনা ইহানাকে (৩)।

এর আগে, বুধবার ভোরে চারজনের মরদেহ মোহনপুরে পৌঁছায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আশায় থাকা স্বজনরা যখন মরদেহগুলো দেখেন, তখন তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের তীব্র আহাজারিতে পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। যে বাড়িতে চারটি প্রাণের পদচারণে সবসময় মুখর থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে শোকের নিস্তব্ধতা। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় প্রতিবেশীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেই অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ হয়ে যান নাহিদুর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে। ওই দিন রিসোর্টের একটি শৌচাগার থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে আগুনের তীব্রতায় মরদেহগুলো এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। প্রিয়জনেরা কি বেঁচে আছেন, নাকি আগুন তাদের কেড়ে নিয়েছে—সেই চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করেন পরিবারের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

মরদেহ শনাক্তের খবর পাওয়ার পরপরই পরিবারের পক্ষ থেকে নাহিদুর রহমানের মায়ের কবরের পাশে পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়। প্রিয়জনদের শেষ ঠিকানা যে এখানেই হবে, সেই নির্মম সত্য মেনে নেওয়া ছাড়া পরিবারের সদস্যদের আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

নিহত নাহিদুর রহমানের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে তার ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই মেয়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান, পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার (সিআইডি) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানসহ প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত নাহিদুর রহমানের মা তার কোলে মাথা রেখেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মায়ের সেই স্মৃতি বুকে নিয়েই জীবন অতিবাহিত করছিলেন নাহিদুর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এবার সেই মায়ের কবরের পাশেই চিরবিদায় নিলেন তিনি, তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যা।