কক্সবাজারে পর্যটনে গিয়ে আনন্দ আর স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাদের। পরিবারের প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সেই ভ্রমণের সমাপ্তি হওয়ার কথা ছিল হাসি-আনন্দে। কিন্তু টুপটুপ রিসোর্টের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই সব স্বপ্ন আর আনন্দকে বিষাদে পরিণত করল। বেড়াতে গিয়ে প্রাণ হারালেন একই পরিবারের তিনজন সদস্য।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) তাদের নিথর দেহগুলো নারায়ণগঞ্জের নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। প্রিয়জনদের বুকফাটা কান্না আর গভীর শোকে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। পরবর্তীতে জোহরের নামাজের পর ফতুল্লার বায়তুল নাজাত জামে মসজিদে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দাপা ইদ্রাকপুর কবরস্থানে দাদার কবরের পাশেই তাঁদের দাফন করা হয়।
নিহতরা হলেন নাফিজ তেহামি, তার বড় বোন ফারিয়া কবির এবং ফারিয়ার সাত বছর বয়সি ছেলে ফাইজান নূর। জানা গেছে, নাফিজের বাবা জিহাদুল কবির একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। অন্যদিকে, ফারিয়া কবিরের স্বামী নূর আলম ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডে কর্মরত আছেন।
একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণেই এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। স্বজনদের মতে, রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থায় যদি যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হতো, তবে হয়তো এমন করুণ পরিণতি এড়ানো সম্ভব হতো।
২৪ বছর বয়সি নাফিজ তেহামির কথা স্মরণ করে তার বাবা জিহাদুল কবির জানান, নাফিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ‘চাইনিজ ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড কালচার’ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী ছিলেন। মেধাবী এই ছেলেকে নিয়ে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল। পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের যোগ্যতায় পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবেন— এমন প্রত্যাশা ছিল সবার। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো পূরণের আগেই নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ।
অন্যদিকে, ফারিয়া কবিরের স্বামী নূর আলমের কাছে এই শোকের ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাদের সাত বছর বয়সি ছেলে ফাইজান নূর চুয়াডাঙ্গার প্রদীপন মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের কেজি টু শ্রেণিতে পড়ত। যে বয়সে বই-খাতা, স্কুল আর খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই আগুন কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ।
একই পরিবারের তিনজনের এমন আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা। তারা পুনরায় অভিযোগ করেন যে, রিসোর্টের নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় চরম গাফিলতি ছিল। যথাযথ সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে এই প্রাণহানি এড়ানো যেত বলে তারা মনে করেন।
উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ১১ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে নাফিজ তেহামি, ফারিয়া কবির ও ফাইজান নূরের মরদেহ নারায়ণগঞ্জে দাফন করা হয়েছে। অন্য নিহতদের মরদেহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা ও টাঙ্গাইলের নাগরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দাফন করা হয়েছে।