টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি পেসার জেমস অ্যান্ডারসনকে চুক্তির বাইরে রেখেছে ইংলিশ কাউন্টি দল ল্যাঙ্কশায়ার। কিংবদন্তি এই বোলারকে যেভাবে বিদায় জানানো হয়েছে, তাকে চরম 'অসম্মান' হিসেবে অভিহিত করেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের বোলিং সঙ্গী স্টুয়ার্ট ব্রড।
গত রবিবার ল্যাঙ্কশায়ারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অ্যান্ডারসনের সঙ্গে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আর বাড়ানো হচ্ছে না। উল্লেখ্য, সদ্য সমাপ্ত কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ মৌসুমে ৪৪ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ পেসার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছিলেন। মাত্র ১৭ গড়ে ৫০টি উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি তিনি ল্যাঙ্কশায়ারের বর্ষসেরা ক্রিকেটার হিসেবে নির্বাচিত হন।
তবে ক্লাবটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এভাবে শেষ করার ইচ্ছা অ্যান্ডারসনের ছিল না। নিজের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্তটা যদি আমার হাতে থাকত, তবে শেষটা অন্তত এভাবে হতো না। তবে ক্লাবটির খেলোয়াড় ও সমর্থকদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’
ইংল্যান্ডের হয়ে একসঙ্গে ১৩৮টি টেস্ট খেলে ১০৩৯টি উইকেট নেওয়ার স্মৃতি রয়েছে অ্যান্ডারসন ও ব্রডের। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ব্রড আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নেন এবং তার এক বছর পর অ্যান্ডারসনও একই পথ অনুসরণ করেন। বন্ধুর সঙ্গে ল্যাঙ্কশায়ারের এমন আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রড।
নিজের পডকাস্ট ‘ফর দ্য লাভ অব ক্রিকেট’-এ কড়া সমালোচনা করে ব্রড বলেন, ‘আমার মনে হয় ল্যাঙ্কাশায়ার যেভাবে খবরটি অ্যান্ডারসনকে জানিয়েছে, তা অত্যন্ত অসম্মানজনক। এমন একজন কিংবদন্তিকে আরও সম্মানজনকভাবে বিদায় জানানো উচিত ছিল। এ ঘটনা ক্লাবটির সঠিক দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্বের দৈন্যই প্রকাশ করে।’
টেস্ট ক্রিকেটে উইকেট সংগ্রহের তালিকায় কেবল দুই কিংবদন্তি স্পিনার শেন ওয়ার্ন (৭০৮) ও মুত্তিয়া মুরালিধরন (৮০০) অ্যান্ডারসনের চেয়ে এগিয়ে আছেন। ব্রডের মতে, অ্যান্ডারসনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি যেভাবে হয়েছিল, ল্যাঙ্কশায়ারের এই সিদ্ধান্ত তারই এক পুনরাবৃত্তি।
ব্রড আরও বলেন, ‘জিমিকে (অ্যান্ডারসন) নিয়ে আমার খারাপই লাগছে। ২০২৪ সালেও (ইংল্যান্ডের ক্রিকেট পরিচালক) রব কি এবং (সাবেক কোচ) ব্রেন্ডন ম্যাককালাম হুট করেই তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দিয়েছিলেন, যা জিমির জন্য বড় ধাক্কা ছিল এবং কাজটা খুব বাজেভাবে করা হয়েছিল। এবারও ঠিক তা-ই হলো, বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অ্যান্ডারসন এর চেয়ে আরও ভালো বিদায় পাওয়ার যোগ্য।’
২০২৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজের শেষ টেস্টে ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছিলেন ব্রড। অন্যদিকে, অ্যান্ডারসন আরও কিছুদিন জাতীয় দলের হয়ে খেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড তাঁর সঙ্গে সামনে এগোতে রাজি ছিল না। ২০২৪ সালে ভারত সফরের পর টিম ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় যে, অ্যান্ডারসন ছাড়াই দল এগিয়ে যাবে। এই আকস্মিক বিদায়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ম্যানচেস্টারের ডাকোটা হোটেলে একটি বৈঠকে ডাকা হয় অ্যান্ডারসনকে। তিনি ভেবেছিলেন এটি তাঁর নিয়মিত বার্ষিক মূল্যায়নের সভা। কিন্তু হোটেলের বারে গিয়ে ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, বেন স্টোকস ও রব কিরের সঙ্গে দেখা হলে তিনি বুঝতে পারেন পরিস্থিতি ভিন্ন।
নিজের আত্মজীবনীতে অ্যান্ডারসন এই অভিজ্ঞতাকে ‘গুডফেলাস’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওই সিনেমায় জো পেস্কির চরিত্রটি বিশেষ স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় একটি ঘরে প্রবেশ করে, কিন্তু সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল ভিন্ন এক পরিণতি। অ্যান্ডারসনের কাছে ইংল্যান্ড ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার খবরটিও ছিল ঠিক তেমনই অপ্রত্যাশিত।
ল্যাঙ্কশায়ার চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর পর পেশাদার ক্রিকেট নিয়ে অ্যান্ডারসন এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। অবসর নেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও এখন পর্যন্ত তাঁর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।