জেমস অ্যান্ডারসনের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য পেশাদার ক্রিকেট ক্যারিয়ার কি এবার শেষ হতে যাচ্ছে? ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যান্ডারসনের বর্তমান ক্লাব ল্যাঙ্কাশায়ার ২০২৭ মৌসুমের জন্য তাঁকে নতুন কোনো চুক্তির প্রস্তাব দেবে না। ক্লাবের এই সিদ্ধান্তের ফলে পেশাদার ক্রিকেটের আঙিনায় নিজের দীর্ঘ যাত্রার ইতি টানতে পারেন এই অভিজ্ঞ পেসার। তবে ৪৪ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেননি।

টেস্ট ক্রিকেটে রেকর্ড ৭০৪টি উইকেট শিকার করা ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি অ্যান্ডারসন ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গন ছাড়ার পরও তিনি কাউন্টির দ্বিতীয় বিভাগের দল ল্যাঙ্কাশায়ারের হয়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বয়স বাড়লেও বল হাতে তাঁর ধার কমেনি। গত মৌসুমে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় বিভাগে তিনি মোট ৫০টি উইকেট নিয়েছেন, যেখানে তাঁর বোলিং গড় ছিল ১৭। ওই বিভাগে এক মৌসুমে অন্তত ৫০টি উইকেট সংগ্রহ করা মাত্র সাতজন বোলারের একজন এই অভিজ্ঞ পেসার।

এত চমৎকার পারফরম্যান্সের পরেও নতুন চুক্তিতে তাঁর নাম না থাকার বিষয়টি সামনে আসায় অ্যান্ডারসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ‘দ্য টাইমস’ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত সোমবার ল্যাঙ্কাশায়ারের নতুন ক্রিকেট পরিচালক পল ফারব্রেস এবং নতুন প্রধান নির্বাহী রিচার্ড কেনিয়ন অ্যান্ডারসনের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়, তবে সেই পরিকল্পনায় অ্যান্ডারসনের জন্য নতুন চুক্তির কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।

উল্লেখ্য, পল ফারব্রেস আগামী ১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই অ্যান্ডারসনকে নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

যদি অ্যান্ডারসন অবসর নেন, তবে তাঁর বিদায় হতে পারে সাবেক সতীর্থ স্টুয়ার্ট ব্রডের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৩ সালে ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাশেজ সিরিজের শেষ টেস্ট খেলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন ব্রড। তাঁর বিদায় ছিল অত্যন্ত নাটকীয়; ব্যাট হাতে শেষ বলে ছক্কা মেরেছিলেন এবং বল হাতে নিজের শেষ ডেলিভারিতে উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। এরপর খেলা সম্প্রচারের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেকে নতুন করে মানিয়ে নিয়েছেন ব্রড।

অন্যদিকে, অ্যান্ডারসন জাতীয় দলের হয়ে আরও কিছুদিন খেলে যেতে চেয়েছিলেন। ক্রিকেটের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা এবং বয়স বাড়লেও নিজের মান ধরে রাখার যে চেষ্টা, তা ছিল চোখে পড়ার মতো। তা সত্ত্বেও ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড অ্যান্ডারসনকে নিয়ে সামনে এগোতে আগ্রহী ছিল না।

২০২৪ সালে ভারত সফরের পর ইংল্যান্ডের টিম ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় যে, অ্যান্ডারসন ছাড়াই সামনে এগোবে দল। কিন্তু এই আকস্মিক বিদায়ের জন্য অ্যান্ডারসন মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।

২০২৪ সালের এপ্রিলে ম্যানচেস্টারের ডাকোটা হোটেলে তাঁকে একটি বৈঠকে ডাকা হয়। অ্যান্ডারসন ভেবেছিলেন, এটি তাঁর নিয়মিত বার্ষিক মূল্যায়নের একটি সাধারণ বৈঠক। কিন্তু হোটেলের বারে গিয়ে ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, বেন স্টোকস ও রব কিরের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অপ্রীতিকর।

নিজের আত্মজীবনীতে ওই ঘটনাকে ‘গুডফেলাস’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন অ্যান্ডারসন। তিনি লিখেছেন, “সিনেমাতে জো পেস্কির চরিত্রটি একটি ঘরে ঢোকে এই ভেবে যে তাকে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হবে, কিন্তু সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল অন্য পরিণতি।” অ্যান্ডারসনের কাছে ইংল্যান্ড ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার খবরটিও ছিল ঠিক তেমনই অপ্রত্যাশিত।

এবার ক্লাবের সিদ্ধান্তের কারণে পেশাদার ক্রিকেটও ছাড়তে হতে পারে অ্যান্ডারসনকে। গত মৌসুমে কাউন্টিতে মাত্র দুটি জয় পাওয়া ল্যাঙ্কাশায়ার তাঁকে ছাড়াই নতুন করে শুরু করতে চায়।

২০০২ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে অ্যান্ডারসন মোট ১১৯৩টি উইকেট নিয়েছেন, যার মধ্যে ৭০৪টি এসেছে টেস্ট ক্রিকেটে। ২০০২ সালের মে মাসে ল্যাঙ্কাশায়ারের হয়ে তাঁর অভিষেক হয়েছিল।

অবসর নিলে অ্যান্ডারসন আপাতত সংবাদমাধ্যমের কাজে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। বর্তমানে তিনি ‘টেইলেন্ডার্স’ পডকাস্টের সঙ্গে যুক্ত আছেন। পাশাপাশি তাঁর বেশ কিছু ব্যবসায়িক উদ্যোগ রয়েছে। যদিও কোচিংয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তবে এই মুহূর্তে তাঁর তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই।