ঘটনাটি প্রায় দুই বছর আগের। সেই সময়ে ইউটিউবে ‘ফেসবুক থেকে মাসে লাখ টাকা আয়’ শীর্ষক ভিডিওর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। ভিডিওগুলোর থাম্বনেইলে এমন চমকপ্রদ এডিটিং করা হতো, যেন ল্যাপটপ চালু করলেই স্ক্রিন থেকে ডলারের বান্ডিল সরাসরি পকেটে ঢুকে যাবে।
সেই সব মোটিভেশনাল ভিডিওর প্রভাবে লেখকের ভেতরেও কোটিপতি হওয়ার এক সুপ্ত বাসনা জাগ্রত হয়। তিনি মনে করেন, মার্ক জাকারবার্গ যখন এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিলোচ্ছেন, তখন তিনি কেন দরিদ্র হয়ে বসে থাকবেন। এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ফেসবুক থেকে ডলার উপার্জনের এক বিশেষ মিশন।
ইউটিউবের সেই ভিডিওগুলো থেকেই তিনি জানতে পারেন যে, ডলার হাতে পেতে হলে একটি ‘ই-টিন’ সার্টিফিকেট প্রয়োজন। ই-টিন আসলে কী বা এর কাজ কী, সে বিষয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র ধারণা বা আগ্রহ ছিল না। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল ডলার অর্জন। তাঁর মনে হয়েছিল, এই সার্টিফিকেটটি যেন আলাদিনের জাদুর চেরাগ। এটি কোনোমতে তৈরি করে ফেসবুকে আপলোড করলেই জাকারবার্গ সাহেব খুশি হয়ে সরাসরি তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডলারের বস্তা পাঠিয়ে দেবেন।
চরম উৎসাহের সাথে ইন্টারনেটে এদিক-ওদিক ক্লিক করে তিনি অনলাইনে একটি ই-টিন খুলে ফেলেন। পিডিএফ ফাইলটি ডাউনলোড করার সময় তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন সুইস ব্যাংকের কোনো গোপন লকার আনলক করেছেন।
এরপর সময় বয়ে গেল দুই বছর। ফেসবুক থেকে এক ডলার তো দূরে থাক, এক সেন্টও তাঁর অ্যাকাউন্টে আসেনি। যে পেজটি তিনি খুলেছিলেন, সেটির রিচ বা দর্শক সংখ্যা এখন এতটাই কম যে মনে হয় পেজটি নিজেই আইসিইউতে চলে গেছে। ফলে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নটি কবেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
মাস শেষে ব্যক্তিগত খরচের জন্য তাঁকে এখনো ‘ব্যাংক অব আব্বা’ অর্থাৎ বাবার কাছেই হাত পাততে হয়। বাবার হোটেলে খেয়ে এবং বাবার পকেটের টাকায় এমবি কিনে তাঁর দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। ই-টিন খোলার কথা তিনি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন।
কিন্তু আসল বিপদটি সামনে এল কয়েক দিন আগে। ফেসবুকে স্ক্রল করার সময় হঠাৎ একটি পোস্টে তাঁর চোখ আটকে যায়। সেখানে লেখা ছিল, যাঁরা ই-টিন করার পর ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করেননি, এনবিআর তাঁদের জরিমানা করেছে।
পোস্টটি পড়ার পর তিনি আক্ষরিক অর্থেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কৌতূহল এবং ভয় নিয়ে অনলাইনে চেক করে তিনি দেখেন, তাঁর নামে নগদ ১০ হাজার টাকা জরিমানা হয়ে আছে। চোখ কচলে পুনরায় পড়ার পর তাঁর মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন, তিনি এক চরম বিপদে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমি ইনকাম ট্যাক্স দেওয়া তো দূরের কথা, আমার আর্থিক অবস্থা এমন যে সরকার চাইলে আমাকেই উল্টো কিছু বেকার ভাতা দিতে পারে। ফেসবুকে ডলার কামানোর আশায় ই-টিন খুলেছিলাম, আর এখন শুনছি জাকারবার্গের ডলার তো আসেইনি, উল্টো দেশি টাকায় আমাকেই সরকারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে!”
লেখকের মতে, একেই বলে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। এখন তিনি যদি তাঁর বাবাকে গিয়ে বলেন, “আব্বা, ফেসবুক থেকে ডলার কামাতে গিয়ে এনবিআরের কাছে ১০ হাজার টাকা জরিমানা খেয়েছি, টাকাটা দাও”—তবে তাঁর বাবা যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তাতে এই ইহকালে তাঁর আর কোটিপতি হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
না জেনে এবং না বুঝে ‘টিন’ ধরতে গিয়ে যে শুধু হাত কাটে না, পকেটও কাটে—সেটি তিনি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।