ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে বলিউড অভিনেতা ইমরান খানকে আগামী বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভারত ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে বোম্বে হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের ফলে আপাতত দেশ ছাড়তে হচ্ছে না তাঁকে। মঙ্গলবার আদালত জানিয়েছে, এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২ নভেম্বর।
জনপ্রিয় অভিনেতা আমির খানের ভাগ্নে ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং তিনি ‘ওভারসিজ ইন্ডিয়ান সিটিজেন’ (ওসিআই) কার্ডের অধিকারী। ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের জন্য ভারত সরকার এই কার্ড প্রদান করে, যার ফলে তাঁরা যখন খুশি ভারতে আসা-যাওয়ার সুযোগ পান। এর মাধ্যমে তাঁরা বিদেশি নাগরিক হয়েও মনেপ্রাণে ভারতীয় হিসেবে থাকতে পারেন, দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করার আইনি অধিকার লাভ করেন। তবে ওসিআই কার্ডধারীদের জন্য একটি সীমাবদ্ধতা হলো, তাঁরা ভারতের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না এবং কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার তাঁদের নেই।
ভারত সরকারের অভিযোগ, ওসিআই কার্ডের শর্তাবলি ভঙ্গ করে ইমরান খান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। এই কারণে ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) তাঁকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশ ত্যাগ করার নির্দেশ জারি করে।
এফআরআরও-এর এই নির্দেশের বৈধতা এবং আইনি যুক্তির চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বোম্বে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন ইমরান। তাঁর দাবি, তিনি কোনো অন্যায় কাজ করেননি এবং ওসিআই কার্ড প্রাপকদের জন্য এমন কোনো শর্ত নেই যা তিনি ভঙ্গ করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ১০ অক্টোবর, যখন মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা এবং এসআইআর প্রক্রিয়া প্রত্যাহারের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ইমরান খান তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে ওই বিক্ষোভে যোগ দিলে পুলিশ তাঁকে আটক করে। এরপরই এফআরআরও তাঁকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশ ছাড়ার হুকুম দেয়।
কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি নাগরিক হয়ে দেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তিনি অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করেছেন। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করে যে, ওসিআই কার্ডটি শর্তাধীন এবং কার্ডধারীরা সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিতে পারেন না।
নোটিশ পাওয়ার পর ইমরান ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টে আবেদনের মাধ্যমে জানান, ২০২৫ সালের অভিবাসন, বিদেশি নাগরিক ও নাগরিকত্ব আইনের কোনোটিই তিনি ভঙ্গ করেননি। তাঁর দাবি, ওসিআই কার্ডে এমন কোনো শর্ত উল্লেখ নেই। তিনি আরও জানান, মুম্বাইয়ের একজন নাগরিক হিসেবে তিনি কেবল নাগরিকদের অবাধ চলাফেরা নিয়ে কথা বলেছেন। আবেদনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঠিক কোন আইনটি তিনি ভেঙেছেন, তা নোটিশে স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি।
এদিকে, দেশ ছাড়ার নোটিশ পাঠানোর পর এফআরআরও তাঁকে পুনরায় একটি শোকজ নোটিশ পাঠায়। সেখানে জানতে চাওয়া হয়, সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে কেন তাঁকে দেশ ছাড়তে বলা হবে না। অর্থাৎ, প্রথম নির্দেশ দেওয়ার পর সরকার দ্বিতীয়বার তাঁকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেয়, যা আইনি জটিলতা তৈরি করেছে যে কোন নোটিশটি চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে।
মঙ্গলবার বোম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মহেশ চন্দ্র ত্রিপাঠী এবং বিচারপতি অদ্বৈত সেঠনার এজলাসে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। ইমরানের আইনজীবী ভেঙ্কটেশ ধোন্ড আদালতকে জানান, বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে শোনা প্রয়োজন কারণ বুধবারই তাঁর মক্কেলকে দেশ ছাড়ার কথা।
সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অনিল সিং উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, মামলাটি নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়ার জন্য তাঁর কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। আদালত তাঁকে সেই সময় প্রদান করে এবং ২ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করে। ততক্ষণ পর্যন্ত দেশ ছাড়ার নোটিশটি স্থগিত থাকবে বলে জানানো হয়।
ইমরান খান তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম এবং নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি মাত্র দুই বছর বয়স থেকে ভারতেই বসবাস করছেন। একজন অভিনেতা হিসেবে এই দেশেই তাঁর কর্মজীবন এবং জীবিকা। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই। তিনি ভারতেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং তাঁর একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘স্বেচ্ছাচার’ বলে অভিহিত করে ইমরান তাঁর আবেদনে বলেন, এই পদক্ষেপ সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, কারণ এই সুরক্ষা বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আবেদনে তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো জামিনযোগ্য এবং এর সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে দুই বছরের কারাদণ্ড।