বলিউড অভিনেতা ইমরান খানকে আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ত্যাগ করতে হবে না। তাঁর বিরুদ্ধে জারি করা ‘ভারত ছাড়ার নির্দেশ’-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বোম্বে হাইকোর্টে শুনানির পর দেশটির সরকার আশ্বস্ত করেছে যে, আপাতত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর নির্দেশটির কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়েছে এবং মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী ২ নভেম্বর বেলা ৩টা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আজ বোম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মহেশচন্দ্র ত্রিপাঠী ও বিচারপতি অদ্বৈত শেঠনার সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। ইমরান খানের পক্ষে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ভেঙ্কটেশ ধোন্দ শুনানির জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা আদালতের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন দপ্তর (এফআরআরও) কর্তৃক জারি করা নির্দেশ অনুযায়ী বুধবারের মধ্যেই অভিনেতাকে ভারত ছাড়তে হতো, যার ফলে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অনিল সিং শুনানির জন্য আদালতের কাছে অতিরিক্ত সময় চেয়ে আবেদন করেন। তিনি আদালতকে আশ্বস্ত করে বলেন, পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইমরানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এই আশ্বাসের পর আদালত মামলাটি ২ নভেম্বর পর্যন্ত মুলতবি করেন এবং চ্যালেঞ্জ করা নির্দেশটির কার্যকারিতা স্থগিত রাখার আদেশ দেন।

কেন এই ভারত ছাড়ার নির্দেশ?

মার্কিন নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ইমরান খানের কাছে ভারতের ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ড রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ অক্টোবর মুম্বাইয়ের এফআরআরও তাঁকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেয়।

এর আগে ১০ অক্টোবর মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানের নিকটবর্তী এলাকায় পুলিশ ইমরানকে আটক করে। তাঁর সঙ্গে আটক করা হয় সঙ্গী লেখা ওয়াশিংটন, মা নুজহাত এবং চাচাতো বোন জয়ন মেরি খানসহ আরও কয়েকজনকে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতিবাদে আয়োজিত একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাঁদের এই আটক করা হয়। জানা গেছে, প্রতিবাদকারীরা কর্মী তুষার গান্ধীর সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রচারাভিযানে সমর্থন জানাচ্ছিলেন এবং তাঁদের মূল দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ।

পরবর্তীতে বিজেপি নেতা কিরীট সোমাইয়া ইমরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ ছিল, একজন বিদেশি নাগরিক হয়েও ইমরান ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই এফআরআরওর পক্ষ থেকে তাঁকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

‘স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনি’, দাবি ইমরানের

এফআরআরওর এই নির্দেশকে ‘স্বেচ্ছাচারী, বেআইনি, বিকৃত ও কঠোর’ বলে অভিহিত করেছেন ইমরান খান। গত ১৭ অক্টোবর তিনি বোম্বে হাইকোর্টে এই নির্দেশ বাতিলের আবেদন জানান। আবেদনে তিনি দাবি করেন, তিনি ২০২৫ সালের অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক আইন কিংবা নাগরিকত্ব আইন লঙ্ঘন করেননি। এছাড়া কোন আইনি বিধান ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে ভারত ছাড়তে বলা হয়েছে, তা নির্দেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

ইমরানের আইনজীবীদের দাবি, তাঁকে আগে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি এবং অভিযোগের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগও দেওয়া হয়নি। যথাযথ তদন্ত ছাড়াই এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। ইমরান আরও দাবি করেন, তিনি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন সেখানে কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল না। তিনি পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে বিক্ষোভস্থলেও প্রবেশ করেননি। বরং নিজের গাড়িতে ফেরার সময় সংবাদকর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরলে পুলিশ তাঁকে আটক করে বলে আবেদনে জানানো হয়েছে।

অভিনেতার দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই নির্দেশ তাঁর সমতা ও জীবন-ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। নির্দেশটি কার্যকর হলে তা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী হবে বলে তিনি দাবি করেন।

ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক

আবেদনে ইমরান ভারতের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, মাত্র দুই বছর বয়স থেকে তিনি ভারতে বসবাস করছেন। তাঁর পরিবার, শিক্ষা, বিয়ে এবং পেশাগত জীবনের সবকিছুই এই দেশটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পূর্ব ইতিহাস নেই বলেও দাবি করেন অভিনেতা। ওসিআই কার্ডধারী হিসেবে তাঁর আইনি অবস্থান বিবেচনা না করেই ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত নির্দেশটি বাতিল করার পাশাপাশি আদালতের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা চেয়ে আবেদন জানান ইমরান খান।