মুম্বাইয়ের জুহুতে অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলিবর্ষণের ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম। এই হামলায় অভিনেতার শরীরে কোনো গুলি লাগেনি বলে জানা গেছে, তবে তাঁর গাড়িচালকসহ মোট দুজন ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ঘটনার পর বিষ্ণোই চক্রের পক্ষ থেকে একটি বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে কেবল টাইগারকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানোর কথা বলা হয়নি, বরং সালমান খানের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য ব্যক্তিদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট হামলার তদন্তের পাশাপাশি বলিউড অঙ্গনে এই অপরাধী চক্রের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

গত সোমবার রাজস্থানের কোটায় পুলিশ একজন অপ্রাপ্তবয়স্কসহ তিন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করেছে। কোটার পুলিশ সুপার তেজস্বিনী গৌতম জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁদের একজনের কাছে রেহানের সঙ্গে বিষ্ণোইয়ের কথিত সহযোগী অনিল পণ্ডিতের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে যে পোস্টের মাধ্যমে হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে, তার সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। লরেন্স বিষ্ণোই নিজে এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন কি না, সে বিষয়েও কোনো প্রতিষ্ঠিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পাঞ্জাবের একটি গ্রাম থেকে অপরাধজগতের শীর্ষে আরোহণের গল্প লরেন্স বিষ্ণোইয়ের। ১৯৯৩ সালে পাঞ্জাবে জন্ম নেওয়া লরেন্স শৈশব অতিবাহিত করেন আবোহার এলাকায় এবং পরবর্তীতে পড়াশোনার জন্য চণ্ডীগড়ে যান। ডিএভি কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানেই গোল্ডি ব্রারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ছাত্ররাজনীতির সংঘাতের পথ ধরে ধীরে ধীরে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন হামলা, হত্যাচেষ্টা ও চাঁদাবাজির মামলায়। গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি থাকার সময়েও লরেন্স অন্য অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং কারাগারের বাইরের সহযোগীদের মাধ্যমে তাঁর অপরাধী চক্রকে আরও বিস্তৃত করেন। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অসংখ্য অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। বর্তমানে লরেন্স গুজরাটের আহমেদাবাদের সবরমতি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে তাঁকে কারাগারের বাইরে নেওয়ার বিষয়ে কড়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং অন্য কোনো তদন্ত সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়।

সালমান খানের সঙ্গে লরেন্সের বৈরিতার মূল কারণ ১৯৯৮ সালে কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের ঘটনা। রাজস্থানে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ ছবির শুটিং চলাকালীন সালমানের বিরুদ্ধে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার অভিযোগ ওঠে। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ এই প্রাণীটিকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করেন এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় তাঁদের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ২০১৮ সালে ওই মামলায় সালমানের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়, যদিও পরবর্তীতে তিনি জামিন পান। একই বছর লরেন্স প্রকাশ্যে অভিনেতাকে হত্যার হুমকি দেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে সালমানকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয় এবং হত্যার হুমকি দেওয়া অব্যাহত থাকে। ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমানের বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টসের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি গুলি চালান। পরবর্তীতে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলাটি বিষ্ণোই চক্রের নির্দেশে চালানো হয়েছিল। লরেন্সের ভাই আনমোলের নামে ছড়িয়ে দেওয়া এক বার্তায় এই ঘটনাটিকে ভবিষ্যৎ হামলার একটি সতর্কসংকেত হিসেবে তুলে ধরা হয়।

বিনোদনজগতে বিষ্ণোই চক্রের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ২০২২ সালের ২৯ মে পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা হত্যার পর। বিদেশ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন গোল্ডি ব্রার। ভারতের তদন্ত সংস্থাগুলোও ওই হত্যাকাণ্ডে বিষ্ণোইয়ের সহযোগীদের অভিযুক্ত করে। এরপর ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে খুন হন মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিক, যাঁর সঙ্গে সালমানসহ বলিউডের অনেক তারকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পর বিষ্ণোই চক্রের নামে দেওয়া একটি পোস্টে সালমানকে সহায়তা করা ব্যক্তিদের হুমকি দেওয়া হয়। ফলে সালমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নটি তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের নিরাপত্তার উদ্বেগেও রূপ নেয়। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কানাডার সারেতে কপিল শর্মার ক্যাফেতে একাধিকবার গুলি চালানো হয়। একটি হামলার দায় স্বীকারের সঙ্গে সালমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রসঙ্গ তোলা হয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পরিচালক রোহিত শেঠির জুহুর বাড়িতে গুলির ঘটনার পর বিষ্ণোইয়ের সহযোগী পরিচয়ে দায় স্বীকারের বার্তা আসে।

তারকাদের ওপর হামলা এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায় স্বীকারের এই ধারা কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নয়, বরং পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার একটি কৌশল। ‘হু কিলড মুসেওয়ালা?’ বইয়ের লেখক ও সাংবাদিক জুপিন্দরজিৎ সিং আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বক্তব্যে এই পরিচিতি এবং আতঙ্কের অর্থনৈতিক দিকটি ব্যাখ্যা করেছেন। সিএনএনের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, কারাগার থেকে যোগাযোগ রক্ষা করা, বিদেশে থাকা সহযোগীদের ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে এই চক্রটি নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার অভিযোগপত্রের বরাতে সেখানে বলা হয়েছে, এই চক্রের সদস্যদের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়, যার ফলে একজন সদস্য ধরা পড়লেও অন্যদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, এনডিটিভি ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।