বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে পুলিশ। এই ঘটনার সাথে জড়িত আরও এক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার হরিয়ানার সোনিপত জেলার বড়োদা গ্রাম থেকে অঙ্কিত নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। এই পুরো ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক সন্দেহ, এই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন ১৮ বছর বয়সী অঙ্কিত ওরফে রাজেশ খাটক। বর্তমানে তাঁকে ট্রানজিট রিমান্ডে নিয়ে মুম্বাইয়ে পাঠানো হচ্ছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে, কুণালের দেওয়া নির্দেশে রাধা ও ববিতা নামের দুই নারী ট্রেনে করে পিস্তল এবং ২০টি কার্তুজ মুম্বাইয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
গত রোববার সন্ধ্যা সাতটার দিকে মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে পাঁচ রাউন্ড গুলি চালায় তিন হামলাকারী। মোটরসাইকেলে করে এসে এই হামলা চালানোর পর তারা দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন রাজস্থানের কোটা জংশন থেকে তিন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল ভোর চারটার দিকে তাঁদের মুম্বাইয়ে আনা হয় এবং ওই দিনই তাঁদের আদালতে হাজির করার কথা ছিল।
পুরো বিষয়টি তদন্ত করছে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৯(১) ও ৩(৫) ধারায় খুনের চেষ্টা এবং অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। কোটা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তিন ব্যক্তির নাম ফুল সিং, রেহান ও ঋত্বিক। ফুল সিং ও রেহান হরিয়ানার সোনিপতের বাসিন্দা এবং ঋত্বিক বিহারের বেগুসরাইয়ের বাসিন্দা। পুলিশের অভিযোগ, এই তিনজনই সরাসরি টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালিয়েছিলেন। পুরো পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সাথে যুক্ত অনিল পণ্ডিতকে, যিনি বিদেশে অবস্থান করে এই ষড়যন্ত্র সাজিয়েছেন বলে পুলিশের ধারণা।
গত মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখা হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশ থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে হরিয়ানার সোনিপত জেলার বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী কুণাল ও ১৯ বছর বয়সী সুমিত এবং উত্তর প্রদেশের রাধা ও ববিতা রয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁদের মুম্বাই পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের সন্দেহ, এই চারজন লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের অস্ত্র সরবরাহকারী চক্রের অংশ ছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, সন্দেহভাজন গ্যাংস্টার অনিল পণ্ডিতের সাথে কুণালের যোগাযোগ ছিল। ধারণা করা হয়, পণ্ডিত যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁর অপরাধী চক্র পরিচালনা করেন এবং লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সাথে তাঁর গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, কুণাল (১৯) সম্প্রতি অন্য একটি মামলায় জামিন পেয়েছিলেন। সেই সময়ে হরিয়ানার হরসানা গ্রামের এক বন্ধুর মাধ্যমে তাঁর সাথে অনিল পণ্ডিতের পরিচয় হয়। এরপর একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয়। পুলিশের দাবি, পণ্ডিতের নির্দেশ অনুযায়ী সুমিতকে সাথে নিয়ে অমৃতসর থেকে একটি পিস্তল ও ২০টি কার্তুজ সংগ্রহ করেছিলেন কুণাল।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, সংগৃহীত অস্ত্রগুলো মুম্বাইয়ে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাধা ও ববিতাকে। ১৫ অক্টোবর তাঁরা ট্রেনে করে মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন। অভিযোগ অনুযায়ী, কুণাল তাঁদের নয়াদিল্লি রেলস্টেশনে পৌঁছে দেন এবং সেখান থেকে তাঁরা মুম্বাইগামী ট্রেনে ওঠেন। পুলিশের দাবি, পিস্তলটি রাধার ব্যাগে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। যাত্রাপথেও এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে কুণাল তাঁদের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
১৭ অক্টোবর মুম্বাইয়ের দাদর রেলস্টেশনে নামেন রাধা ও ববিতা এবং এরপর তাঁরা একটি হোটেলে ওঠেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, পরে এক নাবালক হোটেলের কাছ থেকে রাধার সেই ব্যাগটি নিয়ে যায়, যার ভেতরে অস্ত্র ছিল। পরদিন ১৮ অক্টোবর মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানো হয়। এই হামলায় অভিনেতা অক্ষত থাকলেও তাঁর চালক ফিরদৌস এবং ঘটনাস্থলে থাকা এক অটোরিকশাচালক গুলিবিদ্ধ হন। তাঁরা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাঁরা বলিউডের একাধিক তারকার বাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করতেন এবং নজরদারি চালাতেন। এই কাজের জন্য তাঁরা অটোচালকদের প্রায় এক হাজার টাকা দিয়ে তারকাদের বাড়ির আশপাশে ঘুরতেন। অনেক সময় গুগলে খোঁজ করে তারকাদের বাড়ির ঠিকানা বের করে সেখানে নজর রাখতেন তাঁরা।
তদন্তকারীরা এখন অভিযুক্তদের গতিবিধি, সংগৃহীত তথ্য এবং সম্ভাব্য অন্যান্য নিশানার বিষয়ে খোঁজখবর করছেন। এই ঘটনায় মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১১১ নম্বর ধারা যুক্ত করেছে, যা সংগঠিত অপরাধের সাথে সম্পর্কিত।
পুলিশের অভিযোগ, গুলি চালানোর পর গত রোববার অনিল পণ্ডিত কুণালের সাথে যোগাযোগ করেন এবং জানান যে হামলাকারীরা মুম্বাইয়ে আটকে পড়েছেন। তাঁদের পালানোর ব্যবস্থা করতে কুণালকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর রাধা ও ববিতা দাদর-হরিদ্বার এক্সপ্রেসে চেপে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন। ২০ অক্টোবর নয়াদিল্লি রেলস্টেশন থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং একই দিনে হরিয়ানার সোনিপত থেকে কুণাল ও সুমিতকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৯ অক্টোবর রাজস্থানের কোটা জংশন থেকে তিন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, যখন তাঁরা ট্রেনে করে জয়পুর হয়ে সড়কপথে দিল্লি হয়ে নেপালে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে রেহানের সাথে টেলিগ্রাম ও সিগন্যালের মতো অ্যাপের মাধ্যমে অনিল পণ্ডিতের যোগাযোগ ছিল। পুলিশের অভিযোগ, রেহান প্রথমে নিজের গ্রামের বাসিন্দা ফুল সিংকে এবং পরে মুম্বাইয়ে বাইক ট্যাক্সি চালানো ঋত্বিককে এই পরিকল্পনায় যুক্ত করেন।
মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা এখন এই চক্রের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখছে। পুলিশের দাবি, হামলাকারীদের আসল লক্ষ্য ছিলেন বলিউড সুপারস্টার সালমান খান। তাঁর বাড়িতেও নজরদারি চালিয়েছিল এই চক্র। তবে সেখানে পুলিশের কড়া নিরাপত্তা দেখে পরিকল্পনা বদলে টাইগার শ্রফকে নিশানা করা হয় বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। এই তথ্য সামনে আসার পর সালমান খানের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। তাঁর গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে সাবমেশিনগান হাতে কমান্ডো মোতায়েন করা হয়েছে।