বলিউড তারকা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় তদন্তে বড় অগ্রগতি করেছে মুম্বাই পুলিশ। এই মামলার ১১তম অভিযুক্ত হিসেবে ২২ বছর বয়সী যুবক প্রাঞ্জল ঠাকরানকে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত রোববার তাঁকে মুম্বাইয়ের এসপ্ল্যানেড আদালতে হাজির করা হলে আদালত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁকে পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ প্রদান করেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১৮ অক্টোবর টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি চালানোর পর অভিযুক্তরা একটি ট্যাক্সিতে করে মুম্বাইয়ের কান্দিভলি থেকে সুরাটে পৌঁছেছিলেন। সেখানে রেললাইনের পাশে অস্ত্রগুলো ফেলে দিয়ে তাঁরা ট্রেনে করে দিল্লি চলে যান। পরবর্তীতে এক শুটারের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ ওই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, হরিয়ানার সোনিপতের বাসিন্দা প্রাঞ্জল শুটারদের জন্য দেশি পিস্তল সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মামলার মূল অভিযুক্ত অনিল পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং অপরাধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করেছিলেন।
এর আগে জিগানা পিস্তল সরবরাহের অভিযোগে কুণাল সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বর্তমানে অস্ত্র সরবরাহের এই পুরো শৃঙ্খল এবং ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এ পর্যন্ত এই মামলায় মোট ১১ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মুম্বাই পুলিশের দাবি, টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনাতেও জিগানা পিস্তল ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। ২৫ অক্টোবর সুরাট রেলস্টেশনের নিকটবর্তী একটি ঝোপ থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশি পিস্তল এবং ১০টি অব্যবহৃত কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, গুলি চালানোর সময় জিগানা পিস্তলটি আটকে গিয়েছিল এবং দুটি কার্তুজ বাইরে পড়ে যায়। শুটারদের ওই পিস্তল চালানোর বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল না বলেও পুলিশের ধারণা। তবে নিশ্চিত হতে অস্ত্রগুলো ব্যালিস্টিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, জিগানা হলো তুরস্কে তৈরি একটি আধা স্বয়ংক্রিয় পিস্তল, যা ভারতের একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে। একটি ম্যাগাজিন থেকে এই পিস্তলে সর্বোচ্চ ১৫টি গুলি ছোড়া সম্ভব। ভারতে এর আনুমানিক দাম ২ লাখ থেকে ৭ লাখ রুপি। ২০২৩ সালে উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজে গ্যাংস্টার আতিক আহমেদ ও তাঁর ভাই আশরাফের হত্যাকাণ্ডেও জিগানা পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া বাবা সিদ্দিকি হত্যাকাণ্ড এবং সালমান খানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে গুলি চালানোর ঘটনাতেও এই পিস্তল ব্যবহারের কথা সামনে এসেছিল। টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় অস্ত্র সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্ক এবং অভিযুক্তদের পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে মুম্বাই পুলিশ।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার এড়াতে প্রাঞ্জল বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। তিনি হোটেলে না থেকে ইন্দোরের একটি হাসপাতালে রাত কাটাতেন, যেখানে তাঁর ভাইয়ের চিকিৎসা চলছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, হোটেলে থাকলে পুলিশ সহজেই তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে পারত, তাই তিনি এই কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।
পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, প্রকৌশলবিদ্যার ছাত্র প্রাঞ্জল প্রায় পাঁচ দিন আগে সোনিপত থেকে ইন্দোরে এসেছিলেন তাঁর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য। সোনিপতের যে হাসপাতালে তাঁর ভাই ভর্তি ছিলেন, সেখান থেকে তাঁকে ইন্দোরের মালওয়া মিল চৌরাস্তার কাছে অঙ্কুর স্টেপ-ডাউন সেন্টারে রোবোটিক অস্ত্রোপচারের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা আগে থেকেই প্রাঞ্জলের খোঁজ করছিল। তিনি সোনিপত ছেড়ে ইন্দোরে চলে যাওয়ায় পুলিশ তাঁর অবস্থান জানতে পারে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ইন্দোর পুলিশের অপরাধ দমন শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করে মুম্বাই পুলিশ। এরপর দুই দলের সমন্বয়ে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখার প্রায় চারজন কর্মকর্তা এবং ইন্দোর পুলিশের আটজন সদস্য অংশ নেন। ইন্দোর পুলিশের অপরাধ দমন শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার রাজেশ দণ্ডোতিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, মুম্বাইয়ে গুলি চালানোর ঘটনায় প্রাঞ্জলের সন্দেহজনক ভূমিকার বিষয়ে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা ইন্দোর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।
মূল অভিযুক্ত অনিল পণ্ডিতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং জিগানা পিস্তল সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে প্রাঞ্জলের বিরুদ্ধে। গতকাল এসপ্ল্যানেড বা কিলা আদালত তাঁকে ছয় দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠান। অন্য অভিযুক্তদের ভূমিকা এবং কথিত ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, ১৮ অক্টোবর টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর প্রায় ১৫ দিন আগে প্রাঞ্জল ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। সেই ভিডিওতে তাঁর গলায় বুলেট ঝোলানো ছিল এবং হাতে ছিল একটি পিস্তল। নিজেকে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের অনুরাগী বলে পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে অপরাধমূলক ঘটনা নিয়ে কথাবার্তা বলতেও দেখা গিয়েছিল। নিজেকে হিন্দু কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সভাপতি বলেও পরিচয় দিতেন তিনি। এ ছাড়া চলতি বছরের মার্চে পানিপথের একটি মুদ্রা বিনিময় দপ্তরে গুলি চালানোর ঘটনাতেও প্রাঞ্জলের নাম জড়িয়েছিল বলে অভিযোগ। এই সব দিক খতিয়ে দেখে মামলার বিভিন্ন সূত্রের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে মুম্বাই পুলিশ।