ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দেশত্যাগের নির্দেশ পাওয়ার পর বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিনেতা ইমরান খান। গত শনিবার হাইকোর্টে আবেদন দাখিল করে তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এই নির্দেশটি সম্পূর্ণ একতরফা, অকারণ এবং ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, ‘ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া’ বা ‘ওসিআই’ কার্ডধারীদের জন্য এমন কোনো শর্ত নেই যে তাঁরা কোনো বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না।

আগামীকাল সোমবার বম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মহেশচন্দ্র ত্রিপাঠির এজলাসে এই আবেদনের শুনানি হতে পারে। ইমরান খান দ্রুত এই আবেদনের নিষ্পত্তি করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ‘ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস’ (এফআরআরও) ইমরানকে আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিল। ইমরানের আইনজীবীরা এই নির্দেশকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রশাসনের অভিযোগ, বিদেশি নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ইমরান খান ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) একটি প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। এই কারণেই তড়িঘড়ি তাঁকে দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং ওসিআই কার্ডধারী। আর নিয়ম অনুযায়ী, ওসিআই কার্ডধারীরা দেশে কোনো সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিতে পারেন না।

এই নির্দেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করে ইমরান তাঁর আবেদনে তিনটি প্রধান যুক্তি দিয়েছেন। প্রথমত, ওসিআই কার্ডধারীদের জন্য এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। দ্বিতীয়ত, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন; কোনো বিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এবং চলাচলের অধিকার থাকা কোনো অপরাধ হতে পারে না। তৃতীয়ত, তাঁর কোনো বক্তব্য গ্রহণ না করেই দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, পুরো বিষয়টি অসাংবিধানিক, একতরফা ও ভুল ধারণাপ্রসূত এবং এটি ‘সরকারি ঔদ্ধত্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চরমতম নিদর্শন’।

ইমরান অনুরোধ করেছেন, তাঁর আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যেন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়। তাঁকে যেন জবরদস্তি করে বিদেশে পাঠানো না হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ‘লুক আউট’ নোটিশ জারি করা না হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইমরান যেদিন বম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেন, ঠিক সেই দিনই এফআরআরও তাঁকে আরও একটি নোটিশ পাঠায়। এটি মূলত একটি শোকজ বা কারণ দর্শানোর চিঠি, যেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে কেন তাঁর ওসিআই কার্ড বাতিল করা হবে না।

ইমরানের আইনজীবীদের মতে, এই দ্বিতীয় নোটিশটি তাঁদের জন্য একটি বড় হাতিয়ার। প্রশ্ন উঠেছে, যদি তড়িঘড়ি দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকে, তবে এখন শোকজ করা হচ্ছে কেন? এর অর্থ কি এই যে, তাঁর বক্তব্য না শুনেই দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়াটা ভুল ছিল? এই দ্বিতীয় নোটিশটিই যেন সেই স্বীকারোক্তির প্রমাণ। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, এফআরআরও প্রথামাফিক নিয়ম মেনে চলেনি এবং এখন ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করছে।

দ্বিতীয় নোটিশটি সম্পর্কে গণমাধ্যমে কথা বলেন ইমরানের আইনজীবী জুলফিকার মেমন। তিনি বলেন, ‘নতুন নোটিশটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আদালতে শুনানির সময় এই দ্বিতীয় নোটিশের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। আমরা জানতে চাইব, কোন নোটিশ প্রণিধানযোগ্য। প্রথমটি, না দ্বিতীয়টি। দ্বিতীয় নোটিশটি গুরুত্বপূর্ণ হলে প্রথমটি অকার্যকর হয়ে যায়।’

ইমরান তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁকে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে এবং এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। তিনি দাবি করেন, সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ ওসিআই কার্ডধারীদের সমতার অধিকার দিয়েছে এবং ২১ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষার অধিকার প্রদান করেছে। নোটিশটি স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়ে বলা হয়েছে, তা না হলে এটি হবে ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী এবং ভারতীয় সংবিধানের উপহাস। তাঁর দাবি, দেশত্যাগের নোটিশটি জারি করার আগে কর্তৃপক্ষ একবারও চিন্তা করেনি এবং এটি সম্পূর্ণ খেয়ালের বশে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত।

আইন অনুযায়ী, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বিপজ্জনক মনে হলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ওসিআই কার্ড বাতিল করতে পারে। নাগরিকত্ব আইনের ৭ডি (ই) ধারায় এই অধিকার দেওয়া হয়েছে।

৪৪ বছর বয়সী অভিনেতা ইমরান খান ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে তাঁর জন্ম। তিনি জনপ্রিয় অভিনেতা আমির খানের ভাগনে।