নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কারণে ২০১৯ সালে ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ। এবার একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন বলিউড অভিনেতা ইমরান খান। রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তাঁকে ভারত ছাড়ার নোটিশ দিয়েছে মুম্বাই পুলিশ। পুলিশ তাঁকে আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। যদিও এই দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন, তবে বিদেশি নাগরিক হিসেবে তারকাদের ভারতে অবস্থান এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অংশগ্রহণের বিষয়টি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর আগে অক্ষয় কুমার, দিলজিৎ দোসাঞ্জ এবং আদনান সামির মতো অনেক তারকা নাগরিকত্ব, ভিসা কিংবা ওসিআই (OCI) কার্ড নিয়ে বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়েছেন।
কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ভারতীয় নাগরিক হয়ে ওঠা অক্ষয় কুমারের বিষয়টি ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অমৃতসরে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতে তাঁর অভিনয় জীবন সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছালেও দীর্ঘ সময় তাঁর কাছে কানাডার পাসপোর্ট ছিল। অবশেষে ২০২৩ সালের ১৫ আগস্ট অক্ষয় কুমার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় নাগরিকত্বের কথা জানান এবং একই সাথে কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন।
অন্যদিকে, পাঞ্জাবি গায়ক ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ তাঁর অনন্য গান ও অভিনয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় নাগরিক ছিলেন, তবে ২০২২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি মার্কিন পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। যেহেতু ভারতে দ্বৈত নাগরিকত্বের কোনো ব্যবস্থা নেই, তাই তাঁকে ভারতে যাতায়াতের জন্য ই-ভিসার ওপর নির্ভর করতে হয়। উল্লেখ্য, তাঁর কাছে ভারতের ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ডও নেই।
লন্ডনে জন্ম নেওয়া গায়ক আদনান সামির ক্ষেত্রে দেখা যায় পাকিস্তানি নাগরিকত্ব ছেড়ে ভারতীয় নাগরিক হওয়ার ঘটনা। একসময় তিনি পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন এবং ২০০১ সালে ভারতে আসেন। ভারতে বসবাস ও কাজ করার পাশাপাশি তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা চলে। ২০১৫ সালে আদনানের পাকিস্তানি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি ভারতে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি ও ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন। অবশেষে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করেন।
ওসিআই কার্ড নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন মার্কিন নাগরিক কন্নড় অভিনেতা ও সমাজকর্মী চেতন কুমার অহিংসা, যিনি চেতন কুমার নামে পরিচিত। তিনি ওসিআই কার্ডের সুবিধায় ভারতে বসবাস করে অভিনয় ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তবে ২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কিছু মন্তব্যের কারণে বিতর্ক শুরু হয়। ওই বছরের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর ওসিআই সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে চেতন এই সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেন এবং ২০২৩ সালের এপ্রিলে কর্ণাটক হাইকোর্ট তাঁর কার্ড বাতিলের নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। উল্লেখ্য, ওসিআই কার্ড বিদেশি নাগরিকদের ভারতে বসবাসের বিশেষ সুবিধা দিলেও এটি ভারতীয় নাগরিকত্বের সমতুল্য নয়।
নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে ভারত ছাড়তে হয়েছিল বাংলাদেশি অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদকে। ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা নির্বাচন চলাকালীন তিনি বিতর্কে জড়ান। সে সময় তিনি ব্যবসায়িক ভিসায় ভারতে অবস্থান করে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করছিলেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রায়গঞ্জ কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়ালের সমর্থনে একটি রোড শো ও নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে দেখা যায় ফেরদৌসকে। এই ঘটনার পর বিজেপি নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করে যে, একজন বিদেশি নাগরিকের নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ নিয়মবহির্ভূত। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফেরদৌসের ব্যবসায়িক ভিসা বাতিল করে তাঁকে ভারত ছাড়ার নোটিশ দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁকে কালোতালিকাভুক্তও করা হয়েছিল, যার ফলে তিনি বাংলাদেশে ফিরে যান।
ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভারতে অবস্থান করে আলোচনায় এসেছিলেন বাংলাদেশি অভিনেতা গাজী আবদুন নূর। তিনি বাংলা টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘রানী রাসমণি’তে অভিনয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোকসভা নির্বাচনে দমদম কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী সৌগত রায়ের সমর্থনে একটি নির্বাচনী সমাবেশে তাঁকে দেখা যায়। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের নজরে আনেন বিজেপি। এরপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে ভারত ছাড়ার নোটিশ দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর ভিসার মেয়াদ ২০১৮ সালের ৬ জুলাই শেষ হয়ে গেলেও প্রায় ৯ মাস তিনি ভারতে অবস্থান করেছিলেন, যা কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে ভিসার নিয়ম লঙ্ঘন। তাঁকে বাংলাদেশে ফিরে নতুন ভিসার জন্য আবেদন করতে বলা হয়। তবে গাজী আবদুন নূর দাবি করেছিলেন যে, তিনি ব্যক্তিগত কারণে সেখানে গিয়েছিলেন এবং জেনেশুনে কোনো রাজনৈতিক প্রচারে অংশ নেননি। তা সত্ত্বেও ভারতীয় আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি সরকারের নির্দেশ মেনে চলার কথা জানান।
সম্প্রতি বলিউড অভিনেতা ইমরান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি ভারতীয় নাগরিক না হয়েও অভিবাসন আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর তাঁকে আটক করে মুম্বাই পুলিশ। এরপরই তাঁকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ছাড়ার নোটিশ পাঠানো হয়। তবে ইমরানের আইনজীবী এই নোটিশের বিরুদ্ধে বোম্বে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওসিআই কার্ডধারীদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
চলচ্চিত্র জগতের অনেক পরিচিত মুখ নাগরিকত্ব নিয়ে অতীতে বিতর্কে পড়লেও প্রত্যেকের আইনি পরিস্থিতি ও ঘটনা আলাদা। কারও ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব পরিবর্তন, কারও ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিক হিসেবে কাজ করা, আবার কারও ক্ষেত্রে ভিসা বা ওসিআই কার্ডের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই তালিকায় ক্যাটরিনা কাইফ এবং নোরা ফাতেহির মতো আরও কিছু তারকার নাম রয়েছে।