রাজধানীর কাকরাইল এলাকার এক সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় শপিং মল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলার পর গত ১ অক্টোবর দোকান মালিক সমিতির ঘোষণার মাধ্যমে এই মার্কেটটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই এই মলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তাঁদের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিচারণা করেছেন। তেমনই কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন জাহিন যাঈমাহ্ কবির।

স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি জানান, তখন হয়তো তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন। চারপাশে বন্ধুদের কাঁধে দেখা যেত নানা রঙের ও নকশার স্কুলব্যাগ। কেউ ব্যবহার করত ট্রলি ব্যাগ, কেউ রেসিং কার বা বার্বি থিমের ব্যাগ। সেই সময়ে সাধারণ একটি ব্যাগে তাঁর মন ভরছিল না। ফলে নতুন ব্যাগের জন্য মায়ের কাছে বায়না ধরেন তিনি। তবে মায়ের শর্ত ছিল, আগে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে হবে।

পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হওয়ার পর নতুন ব্যাগ বাছাই করতে রওনা হন তিনি। ২০ তলা এক বিশাল ভবনের সামনে গিয়ে তাঁর যাত্রা থামে, যেখানে লাল আলোয় উজ্জ্বল হয়ে লেখা ছিল, ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি’।

শান্তিনগর ও কাকরাইল মোড়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই মলটির সঙ্গে জাহিনের মতো আরও অনেকেরই আবেগ জড়িয়ে আছে। আশপাশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় শিক্ষার্থীদের আনাগোনা ছিল প্রচুর, যার ফলে একসময় এই মার্কেটের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছেছিল। স্কুল শেষ করে মায়ের হাত ধরে সেখানে যাওয়া, ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করা এবং সবশেষে চারতলায় গিয়ে এক প্লেট দইফুচকা খাওয়ার স্মৃতি আজও অমলিন।

তবে বর্তমানে সেই স্মৃতিবিজড়িত শপিং মলের সামনে একটি পিভিসি ব্যানার ঝুলছে, যাতে লেখা রয়েছে ‘১ অক্টোবর থেকে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ’। একসময়ের আলোঝলমলে এই মলে শেষ সময়ে মাত্র ২৫টি দোকান খোলা ছিল।

১৯৯৮ সালে কর্ণফুলী গ্রুপের মাধ্যমে ২০ তলা এই ভবনের বেজমেন্ট ও চারতলা নিয়ে যাত্রা শুরু করে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ভবনের উপরের তলাগুলো ছিল আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট। শুরুতে এখানে মোট ১৯৮টি দোকান ছিল। তৎকালীন সময়ে ক্যাপসুল লিফট, নিজস্ব জেনারেটর এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশের কারণে রাজধানীর অন্যান্য মার্কেটের তুলনায় এটি বেশ আলাদা ও আধুনিক ছিল।

এখানে প্রসাধনী, উপহারসামগ্রী, শাড়ি, থ্রি-পিস, ছেলেদের পোশাক, গয়না এবং ওপরতলায় ফুডকোর্ট ছিল। ঈদ বা যেকোনো উৎসবের মৌসুমে এক ছাদের নিচে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যেত। তবে জাহিনের কাছে এই মলের প্রধান আকর্ষণ ছিল নতুন স্কুলব্যাগ এবং মুখরোচক খাবার।

বিশেষ করে দুপুর এবং সন্ধ্যায় এই মলে ক্রেতাদের ভিড় সবচেয়ে বেশি হতো। কেউ কেনাকাটা করতেন, আবার কেউ পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতেন। সেফটিপিন থেকে শুরু করে জুতা, ব্যাগ, শাড়ি, গয়না ও খেলনা—সবই এখানে পাওয়া যেত। ফলে দৈনন্দিন প্রয়োজন থেকে শুরু করে উৎসব পর্যন্ত সব ধরনের ক্রেতার ভরসাস্থল ছিল এই মল।

তবে গত দশ বছরে এই মলের জৌলুস ধীরে ধীরে ফিকে হতে থাকে। নতুন ও বড় বড় শপিং মলের ভিড়ে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি তার জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির দোকানমালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ ওসমানী মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে শপিং মলটিতে বেচাবিক্রি ধীরে ধীরে কমেছে। তাঁর ভাষ্যমতে, বেশ কয়েকটি কারণে মার্কেট ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। প্রথমে মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় তীব্র যানজট, পরে করোনা মহামারি।

করোনা মহামারির সময়েই শতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সেগুলো আর চালু হয়নি। ক্রেতা কমে যাওয়ায় দোকানমালিকেরা শেষ পর্যন্ত মার্কেটটি বন্ধ করে মালিকানা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওসমানী জানান, জায়গাটি বিক্রির বিষয়ে হাসপাতাল, ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাহিন জানান, তিনি শেষবার বছর তিনেক আগে ব্যাগ কিনতে এই মলে গিয়েছিলেন। এরপর বাইরে থেকে দেখলেও ভেতরে কেনাকাটার সুযোগ খুব একটা পাননি। একের পর এক দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেনাকাটার সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়, যা ক্রেতাদের আরও কমিয়ে দেয়। এককালের জনপ্রিয় মলের এই পরিণতি যেন এক বড় ইঙ্গিত। ক্রেতার রুচি, কেনাকাটার ধরন এবং বড় মলের প্রতিযোগিতায় পুরনোদের টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাওয়া দেখে তিনি প্রশ্ন করেন, সময়ের সঙ্গে আপডেটেড না হলে মানুষও কি এভাবে পিছিয়ে পড়ে? তবুও অনেকের কাছে কর্ণফুলী মল হয়ে থাকবে শৈশবের রঙিন স্কুলব্যাগের এক অমলিন স্মৃতি।