সাধারণত মানুষ ভূতকে খুব ভয় পায়, তবে পাওনাদারের ভয় তার চেয়েও অনেক বেশি। ভূতের একটি বিশেষ গুণ হলো তারা সাধারণত টাকা চায় না, আর এই একটি দিক দিয়েই তারা মানুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

রফিক নামের এক ব্যক্তি ভূতকে মোটেও ভয় পান না। সুকুমারের চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়ার সময় তিনি প্রায়ই বলে বেড়াতেন, “ভূত দেখলে আমি চা খাওয়াব।”

তার কথা শুনে মাসুদ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “চা খাওয়াবি কেন?”

রফিক উত্তর দিলেন, “মিতালি করব।”

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্বপন জানতে চাইলেন, “মিতালি করলে লাভ কী?”

রফিক বেশ গম্ভীর হয়ে বললেন, “রাতে পাহারা দেওয়ার লোক পাওয়া যাবে।”

সেই রাতে রফিক তার বারান্দায় দুটি চেয়ার এবং দুটি কাপ সাজিয়ে রাখলেন। তার স্ত্রী এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “দুটো চেয়ার কেন?”

রফিক উত্তর দিলেন, “অতিথি আসবে।”

স্ত্রী পুনরায় জানতে চাইলেন, “কে?”

রফিক সোজা কথায় বললেন, “ভূত।”

ভূত আসবে শুনে স্ত্রী চরমভাবে চমকে উঠলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন, “ভূতকে চা খাওয়ানোর আগে বাজারের বাকি টাকাটা দিয়ো।”

স্ত্রী কথাটি বলার পর রফিক আর কোনো কথা বাড়ালেন না। ঠিক তিন রাত পর সত্যিই একজন অতিথি এল। পরনে সাদা পোশাক এবং মাথায় এলোমেলো চুল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “চা আছে?”

রফিক বুক শক্ত করে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি ভূত?”

সে উত্তর দিল, “জি।”

রফিক জানতে চাইলেন, “কী খান?”

ভূতটি বলল, “চা। তবে চিনি কম।”

ঈদযাত্রার টিকিট পাওয়ার মতো চরম বিস্ময়ের সাথে রফিক বললেন, “মরার পরও ডায়াবেটিস?”

ভূতটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল, “মরণেও রেহাই নেই।”

চা খেতে খেতে ভূতটি পুরনো দিনের স্মৃতিচারণা করতে শুরু করল। সে বলল, “আগে আমাদের খুব কদর ছিল। রাত হলেই মানুষ আমাদের কথা ভেবে ভয় পেত। এখন রাত-দিন মানুষই মানুষকে ভয় পায়।”

রফিক মাথা নেড়ে তার সাথে একমত হয়ে বললেন, “ঠিক বলেছেন। আমার বাড়িওয়ালি মানুষ।”

সেই দিন থেকে শুরু হলো তাদের মিতালি। প্রতি রাতে ভূতটি আসত এবং রফিক তাকে চা পরিবেশন করতেন। দুজনের মধ্যে গল্প চলত। একদিন ভূতটি রফিককে জিজ্ঞেস করল, “আপনার সংসার কেমন চলছে?”

রফিক হাস্যোজ্জ্বল মুখে উত্তর দিলেন, “আমার সংসার দেখে তো আপনাদেরই ভয় পাওয়ার কথা।”

ভূতটি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “ভাই, আপনাকে একটা পরামর্শ দিই?”

রফিক বললেন, “দেন।”

ভূতটি সতর্ক করে বলল, “মরবেন না।”

রফিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?”

ভূতটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ওপারে গিয়েও বউয়ের কথা শুনতে হয়।”

সেই ঘটনার পর থেকে রফিক আর ভূতটিকে বন্ধু বলে ডাকেন না, বরং ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। কারণ, জীবিতদের মধ্যে এমন অভিজ্ঞ বন্ধু পাওয়া খুব কঠিন, যে সংসার থেকে পালিয়েও শেষ পর্যন্ত সংসার থেকে বাঁচতে পারেনি।