‘ট্রেন টু বুসান’ খ্যাত নির্মাতা ইয়ন সাং-হোর নতুন চলচ্চিত্রে জম্বিরা কেবল মানুষকে আক্রমণই করে না, বরং তারা একে অপরের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। এই অভিনব চিন্তা এবং রক্তস্নাত অ্যাকশন দৃশ্যগুলো ছবিটিকে উপভোগ্য করে তুলেছে, যদিও কাহিনী এবং চরিত্রের গভীরতার ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। জম্বি ঘরানার সিনেমা এখন আর নতুন কিছু নয়। মৃত মানুষের পুনরুত্থান, সংক্রামক রোগের বিস্তার, চারপাশের আতঙ্ক এবং বেঁচে থাকার জন্য মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের লড়াই—এই পরিচিত সূত্র ধরেই বছরের পর বছর অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ফলে বর্তমান সময়ে যেকোনো নতুন জম্বি সিনেমার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দর্শককে নতুন করে ভয় দেখানো। দক্ষিণ কোরিয়ার পরিচালক ইয়ন সাং-হোর ‘কলোনি’ ঠিক সেই চ্যালেঞ্জটিই গ্রহণ করেছে। তাঁর ২০১৬ সালের বিশ্বনন্দিত ছবি ‘ট্রেন টু বুসান’-এর মতোই এই সিনেমাটিও অত্যন্ত দ্রুতগতির, রক্তাক্ত এবং রোমাঞ্চকর। তবে এবারের জম্বিদের বিশেষত্ব হলো, তারা কেবল হিংস্র নয়, বরং দলবদ্ধভাবে চিন্তা করতেও সক্ষম।

সিনেমাটি একনজরে: ‘কলোনি’র ধরন হলো জম্বি অ্যাকশন। এর পরিচালনা করেছেন ইয়ন সাং-হো। অভিনয় করেছেন কু কিও-হোয়ান, জুন জি-হিউন, জি চ্যাং-উক, শিন হিউন, কিম শিন-রোক এবং গো সু। সিনেমাটি জিও হটস্টারে স্ট্রিমিং হচ্ছে এবং এর মোট দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ৩ মিনিট।

ছবির গল্পের সূচনা হয় সিউলের একটি বহুতল ভবনে, যেখানে একটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন চলছিল। প্রতিষ্ঠানটি এমন এক ছত্রাক নিয়ে গবেষণা করছিল, যা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে এবং মৃত কোষকে পুনরায় জীবিত করার ক্ষমতা রাখে। ঠিক এই সময়েই প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কর্মী সিও ইয়ং-চল (কু কিও-হোয়ান) প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় সেখানে হাজির হন। গবেষণার কৃতিত্ব চুরি এবং নিজের প্রতি অবিচারের অভিযোগ থেকে তাঁর মনে জন্ম নেয় তীব্র ক্ষোভ। তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে একটি সংক্রামক উপাদানের মাধ্যমে আক্রান্ত করেন। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। সংক্রমিত মানুষগুলো বিকৃত শরীরের হিংস্র প্রাণীতে পরিণত হয়, যাদের কামড় এবং দেহনিঃসৃত তরলের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে এই সংক্রমণ।

দ্রুতই পুরো ভবনটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে উদ্ধারকাজ শুরু হতে দেরি হওয়ায় ভেতরে আটকে পড়া মানুষগুলো বুঝতে পারে যে, নিজেদের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব এখন নিজেদেরই নিতে হবে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিজ্ঞানী কওন সে-জং (জুন জি-হিউন), তাঁর সাবেক স্বামী হান কিয়ো-সং (গো সু), নিরাপত্তাকর্মী হিউন-সক (জি চ্যাং-উক) এবং তাঁর বোন হিউন-হি (কিম শিন-রোক)। বিভিন্ন বয়স ও পেশার এই মানুষগুলোর সামনে একদিকে যেমন ছিল সংক্রমিতদের ভয়ংকর আক্রমণ, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে তৈরি হওয়া মতবিরোধ ও অবিশ্বাস। নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে হলে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না।

‘কলোনি’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো সংক্রমিতদের দলগত বুদ্ধিমত্তা। সাধারণ জম্বি সিনেমায় আক্রান্তরা মূলত ক্ষুধার তাড়নায় মানুষকে তাড়া করে। কিন্তু এখানে একজন জম্বি যদি কোনো কৌশল শিখে ফেলে, তবে সেই তথ্য দ্রুত অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মানুষের তৈরি করা কোনো ফাঁদ বা দুর্বলতা একবার প্রকাশ পেয়ে গেলে, একই কৌশলে দ্বিতীয়বার তাদের ঠেকানো সম্ভব হয় না।

গল্পের শুরুতে বেঁচে থাকা মানুষগুলো জম্বিদের বিভ্রান্ত করতে দোকানের পুতুল কিংবা বিজ্ঞাপনের কাটআউট ব্যবহার করে। কিন্তু সংক্রমিতরা যখন বুঝতে শেখে যে কোনটি প্রকৃত মানুষ আর কোনটি মানুষের প্রতিরূপ, তখন সেই পুরোনো কৌশল আর কার্যকর থাকে না। তাদের এই সম্মিলিতভাবে শেখার ক্ষমতা একদিকে যেমন আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে বেঁচে থাকা মানুষদের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে করে তোলে আরও অনিশ্চিত।

প্রাণীদের দলগত আচরণের ধারণা থেকেই ছবিটির এই বিশেষ ভাবনাটি এসেছে। সংক্রমিতরা যেন একটি বিশাল মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ হিসেবে কাজ করে। একজনের অভিজ্ঞতা মুহূর্তেই পৌঁছে যায় অন্যদের কাছে। আক্রান্তদের শরীর হঠাৎ একসঙ্গে কেঁপে ওঠা, অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে স্থির হয়ে যাওয়া কিংবা সম্মিলিতভাবে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্যগুলো বেশ অস্বস্তিকর। জম্বিরা এখানে নিছক হেঁটে বেড়ানো মৃতদেহ নয়; তারা ক্রমাগত নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করতে থাকা এক ভয়ংকর দল।

জম্বি সিনেমায় মেকআপ, রক্ত এবং বিকৃত মুখের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। তবে ‘কলোনি’তে নির্মাতা ভয় তৈরির জন্য শরীরী অভিনয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সংক্রমিতদের চরিত্রে এমন সব নৃত্যশিল্পী ও অভিনয়শিল্পীদের নেওয়া হয়েছে যারা শরীরকে অস্বাভাবিকভাবে বাঁকাতে পারদর্শী। ফলে তাদের চলাফেরা প্রচলিত জম্বিদের মতো নয়। কেউ মেঝের ওপর দিয়ে পশুর মতো হামাগুড়ি দেয়, কেউ শরীরকে অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে বাঁকিয়ে ফেলে, আবার কেউ অন্যদের ওপর উঠে তৈরি করে জীবন্ত দেহের স্তূপ।

এই সব দৃশ্যের পেছনে রয়েছে চমৎকার কোরিওগ্রাফি। সংক্রমিতদের সম্মিলিত নড়াচড়া কখনো নৃত্যের মতো, আবার কখনো দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়। বিশেষ করে যখন একজনের চিৎকারে আশপাশের সব আক্রান্ত একই সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে শিকারের দিকে ধেয়ে আসে, তখন বোঝা যায় এই জম্বিদের মোকাবিলা করা কতটা কঠিন।

ভবনের বিভিন্ন স্থানকেও নির্মাতা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ঝকঝকে বিপণিবিতান, অফিস, লিফট, নিরাপত্তাকক্ষ, বেজমেন্ট এবং সরু করিডর—প্রতিটি জায়গাই আলাদা ধরনের বিপদের সুযোগ তৈরি করে। কোথাও বিস্তৃত পরিসরে ধাওয়া, কোথাও অন্ধকার ঘরে লুকিয়ে থাকা, আবার কোথাও বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে নতুন বিপদে পড়ার দৃশ্য দেখা যায়। ক্যামেরার নিখুঁত ব্যবহার, আলো-রঙের বিন্যাস এবং দ্রুত সম্পাদনা অ্যাকশন দৃশ্যগুলোকে আরও কার্যকর করে তুলেছে।

বিপণিবিতানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্যগুলো জর্জ এ রোমেওর বিখ্যাত জম্বি ছবি ‘ডন অব দ্য ডেড’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে ‘কলোনি’ সেই পরিচিত পরিসরে সংক্রমিতদের দলগত বুদ্ধিমত্তার ধারণা দিয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জম্বিদের ভয় যতই বাড়ুক, ছবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের আচরণ। বিপদের মুহূর্তে সবাই যে একে অপরের পাশে দাঁড়াবে, তা নয়। কেউ নিজের নিরাপত্তাকে সবার ওপরে রাখে, কেউ ভয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, আবার কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অন্যদের বিপদে ফেলে। বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষের স্বার্থপরতা, অবিশ্বাস এবং নিষ্ঠুরতা বারবার সামনে চলে আসে।

এই জায়গায় ইয়ন সাং-হো মানুষের প্রতি তাঁর পরিচিত সংশয় প্রকাশ করেছেন। ‘ট্রেন টু বুসান’-এর মতো এখানেও বিপর্যয়ের সময় মানুষের নৈতিকতার পরীক্ষা হয়। কে অন্যকে বাঁচাতে নিজের ঝুঁকি নেবে, আর কে নিজের প্রাণ রক্ষার জন্য অন্যকে ফেলে যাবে—এই প্রশ্নগুলো গল্পে বারবার ফিরে আসে।

সিও ইয়ং-চলের চরিত্রটি এই ভাবনার সবচেয়ে অন্ধকার দিক। তার বিশ্বাস, মানুষের চিন্তা ও আচরণ আলাদা হওয়াই বহু সংঘাতের মূল। সংক্রমিতরা যেহেতু একে অপরের সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নেয়, তাই তারা যেন মানুষের চেয়ে উন্নত কোনো প্রজাতি। ব্যক্তিস্বাধীনতার বদলে সে চায় এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে সবাই একই চিন্তা ও নির্দেশে চলবে। তার এই যুক্তি ভয়ংকর হলেও ছবিটিকে শুধু জম্বিদের আক্রমণ আর পালানোর গল্পের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।

তবে সমস্যা হলো, এই গভীর ভাবনাকে নির্মাতা যথেষ্ট বিস্তারিতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বনাম দলগত নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি, ভুল তথ্যের বিস্তার কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহার—এমন কয়েকটি বিষয় ছবিতে উঁকি দিলেও সেগুলো নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়নি। অ্যাকশন এবং পরবর্তী বিপদের দিকে এগোতে গিয়ে গল্প বারবার থেমে যায় এবং পুনরায় শুরু হয়।

জুন জি-হিউনের সে-জং চরিত্রটি গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। বুদ্ধিমান হলেও সামাজিক আচরণে কিছুটা খাপছাড়া এই বিজ্ঞানী বিপদের মুহূর্তে নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতা কাজে লাগান। তিনি প্রচলিত অর্থে আদর্শ নায়িকা নন; তাঁর খামখেয়ালিপনা এবং স্পষ্টবাদিতা চরিত্রটিকে কিছুটা আলাদা করেছে। তবে অনেক সময় তাঁকে চরিত্রের চেয়ে গল্পের প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যম বলেই মনে হয়।

অন্যদিকে সিও ইয়ং-চল চরিত্রে কু কিয়ো-হোয়ান পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দিয়ে নজর কাড়েন। তাঁর প্রতিশোধস্পৃহা এবং বিপজ্জনক আত্মবিশ্বাস ছবির সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। তবে তাঁর পরিকল্পনার পেছনের ক্ষোভের কথা জানা গেলেও চরিত্রটির মানসিক পরিবর্তন বা গভীরতা নিয়ে খুব বেশি কাজ করা হয়নি।

হিউন-সক এবং তাঁর হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা বোন হিউন-হির সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি আবেগ তৈরি করে। বিপদের মধ্যে ভাই-বোনের পারস্পরিক নির্ভরতা গল্পে মানবিকতার জায়গা ধরে রাখে। একই পুরুষের সাবেক ও বর্তমান স্ত্রীকে ঘিরে গড়ে ওঠা সম্পর্কের দিকটিও কিছুটা ব্যতিক্রমী। তবে বাকি অনেক চরিত্রই যেন বিপদ বাড়ানো বা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনেই যুক্ত। তাঁদের ব্যক্তিগত ইতিহাস কিংবা আবেগ দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলার মতো সময় পায় না।

ছবির দৈর্ঘ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই ছবিতে জম্বিদের আক্রমণ, পালানোর পরিকল্পনা এবং নতুন বিপদের মধ্যে যাতায়াত রয়েছে। কিন্তু সব অংশ সমান উত্তেজনাপূর্ণ নয়। কখনো কখনো চরিত্রদের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক মনে হয়, আবার কখনো একই ধরনের বিপদ বারবার ফিরে আসে। ‘ট্রেন টু বুসান’-এর মতো এখানে প্রতিটি মুহূর্তে বিপদের তীব্রতা অনুভব করা যায় না।

‘কলোনি’ কোনো সম্পূর্ণ অভিনব জম্বি সিনেমা নয়, বরং পরিচিত উপাদানের মধ্যে কয়েকটি কার্যকর নতুন কৌশল যোগ করে দর্শককে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করেছে। নির্মাতা সেই লক্ষ্যটি সফলভাবেই অর্জন করতে পেরেছেন।