কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ধর্ষণের শিকার এক তরুণীর নবজাতক সন্তানকে জোরপূর্বক সরিয়ে নিয়ে বিক্রির চেষ্টার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর গতকাল রোববার রাতে পুলিশ নবজাতকটিকে উদ্ধার করে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়েছে।

গত শুক্রবার চৌদ্দগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ওই তরুণী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। অভিযোগ উঠেছে, জন্মের পরপরই নবজাতকের পিতৃপরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত যুবকের স্বজন ও পরিচিত কয়েকজন মিলে হাসপাতাল থেকে শিশুটিকে জোর করে নিয়ে যান।

নবজাতককে মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বিক্রির এই ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ধর্ষণে অভিযুক্ত যুবকের মা ও চাচা, চৌদ্দগ্রামের ওই বেসরকারি হাসপাতালের একজন নার্স এবং নবজাতকটি কেনার সঙ্গে জড়িত আরও একজন ব্যক্তি রয়েছেন।

সোমবার রাত আটটার দিকে কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান মুক্তকণ্ঠকে এই সব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, “রোববার রাতে বিষয়টি জানতে পেরে ডিবি ও চৌদ্দগ্রাম থানা-পুলিশ অভিযান চালিয়ে চার ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে উদ্ধার করে। শিশুটি বর্তমানে মায়ের হেফাজতে রয়েছে। পুরো ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে।”

পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে ধারণা করা হয়েছিল যে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে নবজাতককে কারও কাছে দত্তক দেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযানের সময় পুলিশ এক শ টাকার একটি নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প উদ্ধার করে। সেখানে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে নবজাতককে অন্যত্র হস্তান্তরের কথা উল্লেখ করা ছিল। এই প্রমাণ পাওয়ার পর মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী তরুণীর পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর অসুস্থ নানির চিকিৎসার জন্য তার মা ঢাকায় যান। সেই সুযোগে ওই তরুণী নিজ বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন। পরবর্তীতে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। বিষয়টি অভিযুক্ত যুবকের পরিবারকে জানালে তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। পরিবারের দাবি, এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি সালিশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অভিযুক্ত যুবকের পরিবার তিন লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করে। তবে তরুণীর পরিবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

নবজাতককে বিক্রির অভিযোগে চৌদ্দগ্রাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুর রহমান মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এই মামলায় ধর্ষণে অভিযুক্ত যুবককে প্রধান আসামি করে মোট আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল থেকে নবজাতককে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ওই প্রতিষ্ঠানের একজন নার্স ও দুজন ব্যবস্থাপকসহ বেশ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বর্তমানে নবজাতক বিক্রির ঘটনায় আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।

এই পুরো ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি পৃথক মামলা করা হয়েছে এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধর্ষণ, নির্যাতন এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে সোমবার চৌদ্দগ্রাম থানায় একটি মামলা করা হয়। ভুক্তভোগী তরুণী নিজেই এই মামলার বাদী। এতে অভিযুক্ত যুবক, তার মা, চাচা এবং স্থানীয় এক মাতবরকে আসামি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের মামলায় প্রধান আসামি অভিযুক্ত যুবকসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফ হোছাইন জানান, অজ্ঞাতনামা ১০ জনসহ মোট ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি মামলা হয়েছে। চারজনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রধান অভিযুক্তসহ অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”