কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় এক তরুণীকে ধর্ষণের পর তার জন্ম নেওয়া সন্তানকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত যুবকের পরিবারের বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগীর স্বজনরা। এছাড়া ধর্ষণ এবং নবজাতক বিক্রির মতো এই স্পর্শকাতর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সালিশদারদের মাধ্যমে তিন লাখ টাকা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার।
অভিযুক্ত যুবক জাহিদুল ইসলাম ওরফে আবির চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের কালকোট গ্রামের আমির হোসেন প্রকাশ লাকির ছেলে।
ভুক্তভোগীর মায়ের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, তার বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য তাকে দীর্ঘ সময় ঢাকার একটি হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়েছিল। সেই সুযোগে বাড়িতে থাকা তার মেয়েকে জাহিদুল ইসলাম ওরফে আবির জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশ করে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। চরম ভয়ের কারণে মেয়েটি প্রথম দিকে বিষয়টি কাউকে জানাতে পারেনি। তবে পরবর্তীতে শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করার পর সে তার মায়ের কাছে সব বিস্তারিত জানায়। ভুক্তভোগীর মা যখন বিষয়টি অভিযুক্তের পরিবারকে জানান, তখন তারা প্রথমে ঘটনাটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং উল্টো ভুক্তভোগী তরুণীকে নিয়ে নানা ধরনের অপবাদ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে অভিযুক্ত যুবক ঘটনাটি স্বীকার করলে তার পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে অভিযুক্তের পরিবার সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এরপর বিষয়টি আইনি পথে নিষ্পত্তির পরিবর্তে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা চালানো হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ যে, অভিযুক্তের বাবা প্রবাসে থাকায় তার জেঠা নজরুল ইসলাম মনির শুরু থেকেই পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই উদ্দেশ্যে একই গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি হাজী মোস্তফার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মাকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ঘটনাটি প্রকাশ না করার জন্য তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর বাবা প্রায় ১২ বছর আগে মারা যান। এরপর থেকে মা ও চার ভাই-বোন নিয়ে পরিবারটি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে। তারা জানান, অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর প্রসবব্যথা শুরু হলে গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে তাকে চৌদ্দগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। তবে সন্তান জন্মের পরপরই নবজাতককে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, নবজাতকের প্রসবসংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয়ভার অভিযুক্ত যুবকের পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর বোন এই মর্মে বলেন, “বাবা মারা যাওয়ার পর মা আমাদের চার ভাই-বোনকে নিয়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছেন। আমার মা নানুর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় থাকার সময় আমার বোনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আমার বোনকে নানা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। পরে আমাদের ওপর চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “শুক্রবার রাতে আমার বোন একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে অন্যত্র বিক্রি করে দেয় অভিযুক্তরা। শুধু তাই নয়, বোনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার হিসেবে তিন লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেই টাকাও দেওয়া হয়নি।”
এই পুরো ঘটনায় সালিশদার হাজী মোস্তফা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি অভিযুক্তের জেঠা মনিরের দোকানে বসা ছিলাম। অন্যরা বাড়ির ভেতরে গিয়ে সমঝোতা করেছে বলে জেনেছি।” তবে টাকার বিনিময়ে সমঝোতা হয়ে থাকলেও তা কত লাখ টাকায় হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। নবজাতক বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি কিছু জানি না।”
অন্যদিকে, অভিযুক্তের জেঠা নজরুল ইসলাম মনির বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। কারা, কীভাবে কী করেছে, তা আপনারা খবর নেন।”
চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফ হোছাইন এই বিষয়ে জানান, “এ ঘটনায় নবজাতক সন্তানসহ একজন আটক আছেন। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।”